২০২৬ সালের ৬ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানায়, উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে মেহেদী নামের এক তরুণ ‘বেটার লাইফ সেন্টার’ নামে একটি কৃষিকেন্দ্র চালাচ্ছেন। ভোরের আগেই দোকান খুলে তিনি বীজ ও ফসল সুরক্ষার পণ্য সাজিয়ে রাখেন, কারণ রোদ চড়ার আগেই আশপাশের গ্রাম থেকে কৃষকেরা আসতে শুরু করেন। পাঁচ বছর আগে তিনি ছিলেন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা এক তরুণ, যাঁর সামনে কোনো স্পষ্ট পথ ছিল না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন তিনি পাঁচ গ্রামের ৫০০-র বেশি কৃষককে সেবা দেন। তিনি শুধু উপকরণ বিক্রি করেন না; ফসলের সমস্যা শনাক্ত করেন, পরামর্শ দেন এবং পরে খোঁজও নেন।
সৈয়দপুর রংপুর বিভাগের নীলফামারী জেলার একটি উপজেলা। সৈয়দপুর বিমানবন্দর ও রেলওয়ে কারখানার জন্য এলাকাটি পরিচিত।

ক্ষুদ্র কৃষকের সামনে যেসব বাধা
বিশ্বব্যাংকের তথ্যে, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত, কিন্তু খাতটির উৎপাদনশীলতা এখনো কম। ক্ষুদ্র কৃষকেরা একসঙ্গে কয়েকটি সমস্যার মুখে পড়েন: মানসম্মত উপকরণ সহজে মেলে না, পরামর্শ আসে খণ্ড খণ্ডভাবে, বাজারদর ওঠানামা করে, আর অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা, লবণাক্ততা ও বাড়তে থাকা তাপমাত্রা চাষের পঞ্জিকাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। নির্ভরযোগ্য পরামর্শ না পেয়ে অনেক কৃষক অনানুষ্ঠানিক ডিলারদের ওপর নির্ভর করতেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ঘাটতি সবচেয়ে বেশি টের পান নারী কৃষকেরা। সম্প্রসারণ সেবা, বাজার ও জনপরিসরে তাঁদের যাতায়াত কম, তাই নতুন তথ্য তাঁদের কাছে পৌঁছায় দেরিতে। বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য, যেসব গ্রামে নারীদের জনসমাবেশে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত, সেখানে এই কেন্দ্রগুলো তাঁদের একত্র হওয়া, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও একসঙ্গে শেখার একটি স্বীকৃত জায়গা হয়ে উঠছে।

বেটার লাইফ ফার্মিং কী
বেটার লাইফ ফার্মিং একটি ‘লাস্ট-মাইল’ উদ্যোগ, যেখানে একসঙ্গে কাজ করছে বায়ার, নেটাফিম, ইয়ারা এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্থ কর্পোরেশন (আইএফসি)। স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত কৃষি উদ্যোক্তারা এক ছাদের নিচে মানসম্মত উপকরণ, জলবায়ু-সহনশীল চাষের পরামর্শ, ডিজিটাল সেবা ও বাজারসংযোগ দেন। তাঁরা সরকারি সম্প্রসারণকর্মী নন, কোনো কোম্পানির এজেন্টও নন; তাঁরা কৃষকের পরিচিত প্রতিবেশী, আর কেন্দ্রটি খোলা থাকে প্রতিদিন।
বাংলাদেশে উদ্যোগটির শুরু ২০২০ সালের শেষ দিকে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর বায়ার ক্রপসায়েন্স ও এসিআই বাংলাদেশের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি হয়; প্রথম ধাপে সারা দেশে ৫৬টি ‘বেটার লাইফ ফার্মিং সেন্টার’ এবং ১৬ হাজার ৮০০ কৃষককে যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনশীলতা নিয়ে ভার্জিনিয়া টেকের ২০২৩ সালের জিএপি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ভারত, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, মেক্সিকো, হন্ডুরাস ও তানজানিয়ায় আড়াই হাজারের বেশি কেন্দ্রের মাধ্যমে উদ্যোগটি ১০ লাখের বেশি ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে পৌঁছেছিল।
কৃষকের মাঠে যে ফল দেখা গেছে
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সৈয়দপুরের কাছের এক গ্রামের কৃষক রহিমা জানান, উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সেচের ভালো পদ্ধতি শেখার পর তাঁর জমির ফলন ১০ মণ থেকে বেড়ে ২০ মণ হয়েছে। প্রতিবেদনে মণকে প্রায় ৩৭ কেজির একক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আরেক কৃষক তরিকুল বলেন, তাঁর আয় আগে ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা, এখন তা ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। বাজার পর্যায়ে উদ্যোক্তারা কৃষকদের ছোট ছোট ফসল একত্র করে বিক্রির ব্যবস্থাও শুরু করেছেন, যাতে বড় ক্রেতা ও ভালো দাম পাওয়া যায়।

তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও সামনের লক্ষ্য
উদ্যোগটির কৃষি পরামর্শক রাজ্জাক নতুন উদ্যোক্তা খুঁজে আনেন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে তিনি বলেন, এলাকায় কাজের অভাব বড় সমস্যা; শিক্ষিত তরুণ স্নাতকেরা উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাবে নয়, সুযোগের অভাবে বসে আছেন। যে দেশে কৃষিকে প্রায়ই ‘ছেড়ে আসার কাজ’ বলে দেখা হয়, সেখানে মেহেদীর মতো উদ্যোক্তারা কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
বিশ্বব্যাংক জানায়, বেটার লাইফ ফার্মিং বাংলাদেশ ১ হাজারের বেশি কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে চায়, যাঁদের অন্তত ২০ শতাংশ হবেন নারী; তাঁরা সারা দেশে আড়াই লাখের বেশি কৃষককে সরাসরি সেবা দেবেন। উদ্যোগটি বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত ‘পার্টনার’ প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে গড়া। ২০২৩ সালের ৭ জুন সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে সই হওয়া অর্থায়ন চুক্তির আওতায় এই প্রকল্পে ৫০ কোটি ডলার দেওয়া হয়; এর লক্ষ্য ফসলের বৈচিত্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং কৃষিতে উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল সেবার প্রসার। উদ্যোগটি বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘এগ্রিকানেক্ট’ কর্মসূচির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য বিশ্বের ৩০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে পৌঁছানো।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিশ্বব্যাংক, বিশ্বব্যাংক (২০২৩ সালের ৭ জুনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ভার্জিনিয়া টেক জিএপি প্রতিবেদন ২০২৩, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)