২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট দেশে জাতীয় শোক দিবস পালিত হয়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ নিহত হন। দিনটি উপলক্ষে দ্য অ্যাগ্রো নিউজ কৃষিবিদ ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের একটি লেখা প্রকাশ করে, যা প্রথম ছাপা হয়েছিল জাগো নিউজ২৪-এ, ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট। লেখাটির বিষয় স্বাধীনতার পরের সাড়ে তিন বছরে শেখ মুজিবুর রহমানের কৃষিভাবনা ও কৃষিনীতি। একই দিনে দৈনিক ইত্তেফাকে বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি সাজ্জাদুল হাসানও এ বিষয়ে লেখেন। দুই লেখা ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য মিলিয়ে সেই সময়ের মূল কৃষি উদ্যোগগুলো এখানে তুলে ধরা হলো।
১৯৭৩ সালের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষণ
ইত্তেফাকের লেখা অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় শেখ মুজিবুর রহমান চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের মতো কৃষিবিদদেরও সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা দেওয়ার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার স্মরণে কৃষিবিদরা প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘কৃষিবিদ দিবস’ পালন করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ড. জাহাঙ্গীর আলমের বর্ণনায়, ওই ভাষণে তিনি গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্র বলেন এবং কৃষিবিদদের শহরমুখী না হয়ে গ্রামে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, আটা ও ভুট্টা নয়, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও শাকসবজিও বোঝায়; তাই এসবের সমন্বিত উৎপাদনের কথা বলেন। পরিকল্পনার আগে পূর্ণাঙ্গ জরিপ, জমির খণ্ডবিখণ্ড হওয়া ঠেকাতে সমবায়ভিত্তিক চাষ এবং ফসল, গবাদিপশু ও মাছের সমন্বয়ের ওপরও জোর দেন। কৃষক দেখে শেখেন, তাই এক গ্রামের ২০ জন কৃষককে মাঠে হাতেকলমে দেখালে আশপাশের কৃষকেরাও তা নিজের জমিতে করবেন, এমন পরামর্শের কথাও লেখায় আছে।

পরিকল্পনা, ঋণ মওকুফ ও খাসজমি
ইত্তেফাকের লেখায় বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষি উন্নয়ন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহের পাশাপাশি কৃষিঋণ মওকুফ, কৃষকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার এবং খাসজমি বিতরণের মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতার চেষ্টা করা হয়। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারির এক ভাষণে তিনি ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলেও লেখাটিতে উল্লেখ আছে। ড. জাহাঙ্গীর আলমের হিসাবে, ১৯৭২-৭৩ সালে উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ১০১ কোটি টাকা রাখা হয়েছিল কৃষি উন্নয়নে।
নতুন ও পুনর্গঠিত কৃষি প্রতিষ্ঠান
স্বাধীনতার পরপর কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়া বা পুনর্গঠন করা হয়। ১৯৭২ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির ৩২ নম্বর আদেশে কৃষি গবেষণা সমন্বয়ের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালে গড়া পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৭৩ সালের ১০ নম্বর আইনে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে পুনর্গঠিত হয়। হর্টিকালচার বোর্ড ও বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি পুনর্গঠন, কৃষি ব্যাংক স্থাপন এবং ১৯৬১ সালে গঠিত কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের উত্তরসূরি বিএডিসিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়। ঢাকায় শুরু হওয়া পরমাণু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৫ সালের গোড়ায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচার (বিনা) হিসেবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্থানান্তরিত হয়।

সার, বীজ, গবাদিপশু ও শীতের ফসল
ড. জাহাঙ্গীর আলমের লেখা অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমান মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, কৃষিতে ভর্তুকি এবং বালাই ব্যবস্থাপনায় জোর দেন। বিদ্যমান সার কারখানাগুলোর উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে নতুন কারখানা গড়ার কথা বলেন। শুরুতে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে মানসম্মত বীজ এনে পরে দেশেই উন্নত বীজ উদ্ভাবন ও উৎপাদনের পরামর্শ দেন। গরু দিয়ে হালচাষ ও গোবর দিয়ে জমির উর্বরতা বাড়ানোর তাগিদও দেন। শীত মৌসুমকে তিনি ফসল উৎপাদনের সবচেয়ে নিশ্চিত মৌসুম মনে করতেন, তাই শীতের ফসলের আবাদ বাড়াতে বলেন। বন্যা নিয়ন্ত্রণকেও তিনি ফসল রক্ষার শর্ত হিসেবে দেখতেন।
ইত্তেফাকের লেখায় ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় দেওয়া তাঁর ভাষণের একটি অংশ উদ্ধৃত হয়েছে: ‘আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয় জাপানের এক একর জমিতে তার তিনগুণ ফসল হয়।’ ওই ভাষণে তিনি জমিতে দ্বিগুণ ফসল ফলানোর আহ্বান জানান।

ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ২৪ (কৃষিবিদ ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের লেখা, ১৫ আগস্ট ২০১৭), দ্য অ্যাগ্রো নিউজ, দৈনিক ইত্তেফাক (সাজ্জাদুল হাসানের লেখা, ১৫ আগস্ট ২০১৯), উইকিপিডিয়া (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি)





মন্তব্য
(০)