প্রতিদিন খাওয়ার জন্য কোন ফলটি ভালো, কলা না আপেল? অনেকের মনের এই সাধারণ প্রশ্নটি নিয়ে ২০২৬ সালের ১১ জুলাই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের লাইফস্টাইল বিভাগ। প্রতিবেদনের উত্তর ছিল, একটিকে অন্যটির চেয়ে ভালো বা খারাপ বলার সুযোগ নেই: দুটি ফলই পুষ্টিকর, দুটিরই আলাদা উপকারিতা আছে, আর কোনটি কার জন্য বেশি উপযোগী তা নির্ভর করে বয়স, শারীরিক অবস্থা, জীবনযাপন ও দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদার ওপর। প্রতিবেদনটি তথ্যের সূত্র হিসেবে স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ভেরি ওয়েল হেলথ ও হেলথশটস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার নাম উল্লেখ করেছিল।
এই প্রতিবেদনে সেই বক্তব্যগুলো মিলিয়ে দেখা হয়েছে খাদ্যের পুষ্টি পরিমাপ ও খাদ্য পরামর্শ নির্ধারণ করে এমন প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সঙ্গে: যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডার, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টস, মেডলাইনপ্লাস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের নিউট্রিশন সোর্স এবং পিয়ার রিভিউড সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা। এদের কারও সমর্থন মেলেনি এমন দাবি বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়: ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে খাদ্যাভ্যাস বদলানোর আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছিল
আপেল সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্যকর ফলের তালিকায় আপেল বরাবরই ওপরের দিকে থাকে, কারণ এতে প্রচুর খাদ্য আঁশ আছে, বিশেষ করে পেকটিন, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে; সঙ্গে আছে ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। নিয়মিত আপেল খেলে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। হৃদ্স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণেও আপেল উপকারী, কারণ এতে ক্যালরি তুলনামূলক কম এবং এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।
কলাকে প্রতিবেদনে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং দ্রুত শক্তির উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যাতে আছে পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, ম্যাগনেসিয়াম ও প্রাকৃতিক শর্করা। অনেকে ব্যায়ামের আগে বা পরে কলা খান, আর এর পটাশিয়াম পেশির স্বাভাবিক কাজে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। ওজন নিয়ন্ত্রণে আপেলকে কিছুটা এগিয়ে রাখা হয়, আর প্রাকৃতিক শর্করা বেশি থাকায় নিয়মিত ব্যায়াম বা ভারী শারীরিক পরিশ্রম করেন এমন মানুষের জন্য কলাকে উপযোগী বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী দুটি ফলই ভিন্ন ভিন্নভাবে হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী, এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে দুটিই খেতে পারেন। শেষে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিদিন একই ফল না খেয়ে সপ্তাহজুড়ে আপেল, কলা, পেয়ারা, পেঁপে, কমলালেবু, আম, লিচুর মতো নানা ফল খেলে শরীর আরও বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট পায়। নিচের অংশগুলোতে এই বক্তব্যগুলো একে একে যাচাই করা হলো।
ইউএসডিএর হিসাবে পাশাপাশি দুই ফল
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রালের এসআর লিগেসি তথ্যসংগ্রহে, যা ২০১৯ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত, দুটি ফলের হিসাবই আছে। রান্না না করা ফলের খাওয়ার উপযোগী অংশের প্রতি ১০০ গ্রামে সেখানে দেওয়া মান এরকম:
- পাকা কলা (রান্না না করা, খোসা ছাড়া): শক্তি ৮৯ কিলোক্যালরি, পানি ৭৪.৯১ গ্রাম, শর্করা ২২.৮৪ গ্রাম, মোট চিনি ১২.২৩ গ্রাম (গ্লুকোজ ৪.৯৮ গ্রাম, ফ্রুক্টোজ ৪.৮৫ গ্রাম ও সুক্রোজ ২.৩৯ গ্রাম), শ্বেতসার ৫.৩৮ গ্রাম, খাদ্য আঁশ ২.৬ গ্রাম, আমিষ ১.০৯ গ্রাম, পটাশিয়াম ৩৫৮ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ২৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৮.৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি৬ ০.৩৬৭ মিলিগ্রাম এবং ফোলেট ২০ মাইক্রোগ্রাম।
- খোসাসহ আপেল (রান্না না করা): শক্তি ৫২ কিলোক্যালরি, পানি ৮৫.৫৬ গ্রাম, শর্করা ১৩.৮১ গ্রাম, মোট চিনি ১০.৩৯ গ্রাম (ফ্রুক্টোজ ৫.৯ গ্রাম, গ্লুকোজ ২.৪৩ গ্রাম ও সুক্রোজ ২.০৭ গ্রাম), শ্বেতসার ০.০৫ গ্রাম, খাদ্য আঁশ ২.৪ গ্রাম, আমিষ ০.২৬ গ্রাম, পটাশিয়াম ১০৭ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪.৬ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি৬ ০.০৪১ মিলিগ্রাম এবং ফোলেট ৩ মাইক্রোগ্রাম।
একই তথ্যভান্ডারে মাঝারি আকারের একটি কলার (লম্বায় ৭ থেকে পৌনে ৮ ইঞ্চি) ওজন ধরা হয়েছে ১১৮ গ্রাম, আর মাঝারি আকারের একটি আপেলের (ব্যাস প্রায় ৩ ইঞ্চি) ১৮২ গ্রাম। হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স হিসাব দিয়েছে প্রতিটি ফল ধরে: মাঝারি আকারের একটি পাকা কলায় প্রায় ১১০ ক্যালরি, ২৮ গ্রাম শর্করা, ৩ গ্রাম আঁশ, ১৫ গ্রাম প্রাকৃতিক চিনি ও ৪৫০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে; মাঝারি আকারের একটি আপেলে থাকে প্রায় ৯৫ ক্যালরি, ২৫ গ্রাম শর্করা, ৩ গ্রাম আঁশ ও ১৯ গ্রাম প্রাকৃতিক চিনি। ফলের আকার ও জাত ভিন্ন হওয়ায় বিভিন্ন সূত্রের সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য থাকে।
এভাবে দেখলে প্রতিবেদনের মূল চিত্রটি টিকে যায়। সমান ওজনে আপেলে ক্যালরি কম ও পানি বেশি, আর এর আঁশের পরিমাণ কলার কাছাকাছি। তালিকার প্রায় সব ভিটামিন ও খনিজ কলায় বেশি, যার মধ্যে আছে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন বি৬ ও ভিটামিন সি; আর কলার শক্তির প্রায় পুরোটাই আসে শর্করা থেকে, যার একটি অংশ শ্বেতসার। কোনো ফলেই চর্বি বা আমিষ তেমন নেই।
আপেল: আঁশ, পেকটিন ও খোসার গুরুত্ব
খাদ্য আঁশ হলো উদ্ভিজ্জ খাবারের সেই অংশ, যা শরীর হজম করতে পারে না। হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স আঁশকে দুই ভাগে ভাগ করে: পানিতে দ্রবণীয় আঁশ ও অদ্রবণীয় আঁশ। আপেলকে সেখানে দুই ধরনেরই উৎস বলা হয়েছে: শাঁস থেকে দ্রবণীয় আঁশ, আর খাওয়ার উপযোগী খোসা থেকে অদ্রবণীয় আঁশ। পেকটিনকে বলা হয়েছে আপেল, বেরি ও অন্যান্য ফলে থাকা দ্রবণীয় ও সহজে গাঁজনযোগ্য আঁশ, যা কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। দ্রবণীয় আঁশ পিত্ত অ্যাসিড তৈরিতে বাধা দিয়ে রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে পারে এবং খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের হঠাৎ বৃদ্ধি ঠেকাতে সাহায্য করতে পারে বলেও সেখানে উল্লেখ আছে।
খোসার গুরুত্ব আলাদা। নিউট্রিশন সোর্সের তথ্যমতে, আপেলের উপকারী উদ্ভিজ্জ যৌগ ও আঁশের বেশির ভাগই থাকে খোসায়, আর খোসা ফেলে দিলে আঁশের বড় অংশ ও ফ্ল্যাভোনয়েডের বেশির ভাগই বাদ পড়ে যায়। এমন একটি ফ্ল্যাভোনয়েড হলো কোয়ারসেটিন, প্রাকৃতিকভাবে থাকা একটি উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক, যার অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও প্রদাহরোধী প্রভাব আছে। স্বচ্ছ আপেলের রস ছাঁকা ও পাস্তুরিত করা হয়, এতে ফ্ল্যাভোনয়েড ও আঁশের বেশির ভাগই চলে যায়; তাই গোটা তাজা ফল থেকেই সবচেয়ে বেশি পুষ্টি মেলে।
কতটা আঁশ দরকার, তা স্বাস্থ্যসেবা সংস্থাগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছে। এনএইচএসের যে পাতাটি সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২ মার্চ পর্যালোচনা করা হয়, সেখানে বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৩০ গ্রাম আঁশ খাওয়ার লক্ষ্য রাখা উচিত, অথচ যুক্তরাজ্যের বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক গড়ে দিনে প্রায় ২০ গ্রাম খান। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দিনে প্রায় ১৫ গ্রাম, ৫ থেকে ১১ বছর বয়সীদের জন্য প্রায় ২০ গ্রাম এবং ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য প্রায় ২৫ গ্রাম আঁশের কথা বলা হয়েছে। এনএইচএসের ভাষ্য, পর্যাপ্ত আঁশ খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও অন্ত্রের ক্যানসারের কম ঝুঁকির সম্পর্ক আছে, আর আঁশ হজমে সাহায্য করে ও কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে। নিউট্রিশন সোর্স দিনে অন্তত ২৫ থেকে ৩৫ গ্রাম আঁশ খাওয়ার পরামর্শ দেয় এবং জানায়, বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক দিনে মাত্র প্রায় ১৫ গ্রাম আঁশ পান।

আপেল, কোলেস্টেরল ও হৃদ্যন্ত্র: গবেষণায় যা মিলেছে
আপেল কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, প্রতিবেদনের এই বক্তব্যের পক্ষে একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার ফল আছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিং এবং ইতালির ফন্দাৎসিওনে এডমুন্ড মাখের গবেষকেরা রক্তে কোলেস্টেরল সামান্য বেশি এমন ৪০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে (২৩ জন নারী ও ১৭ জন পুরুষ) আট সপ্তাহ ধরে দিনে দুটি করে আপেল খাওয়ান, আর আরেক আট সপ্তাহ চিনি ও শক্তির পরিমাণ মিলিয়ে তৈরি একটি পানীয় দেন; দুই পর্বের মাঝে চার সপ্তাহের বিরতি ছিল। আপেলটি ছিল রেনেত্তা কানাডা জাতের, যাতে প্রোঅ্যান্থোসায়ানিডিন নামের পলিফেনল প্রচুর থাকে।
নিয়ন্ত্রণ পানীয়ের তুলনায় গোটা আপেল খাওয়ার পর রক্তে মোট কোলেস্টেরল (প্রতি লিটারে ৫.৮৯ বনাম ৬.১১ মিলিমোল), এলডিএল কোলেস্টেরল (৩.৭২ বনাম ৩.৮৬) ও ট্রাইগ্লিসারাইড (১.১৭ বনাম ১.৩০) কমে এবং ক্ষুদ্র রক্তনালির সাড়া উন্নত হয়। তবে রক্তচাপ বা হৃদ্রোগের অন্যান্য সূচকে কোনো প্রভাব দেখা যায়নি, আর রক্তে ইউরিক অ্যাসিড সামান্য বেড়েছিল। গবেষকদের সিদ্ধান্ত ছিল, কোলেস্টেরল সামান্য বেশি এমন মানুষ প্রতিদিন পলিফেনলসমৃদ্ধ আপেল খেলে কোলেস্টেরল ও রক্তনালির ওপর উপকারী প্রভাবের পক্ষে এই ফল সমর্থন দেয়।
বৃহত্তর প্রমাণ অবশ্য এতটা স্পষ্ট নয়। হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স জানায়, হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর তাজা আপেল, আপেলের সিডার ও আপেলের সাপ্লিমেন্ট নিয়ে মানুষের ওপর করা গবেষণার ফল মিশ্র: সুইডেনের এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় যাঁরা সবচেয়ে বেশি আপেল খেতেন তাঁদের স্ট্রোকের ঝুঁকি কম পাওয়া যায়, অথচ নার্সেস হেলথ স্টাডির এক বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি ও সবচেয়ে কম ফ্ল্যাভোনয়েড গ্রহণকারীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক বা হৃদ্রোগে মৃত্যুর হারে কোনো পার্থক্য মেলেনি। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, স্যাক্রামেন্টোর ডায়ান হাইসন ২০১১ সালে অ্যাডভান্সেস ইন নিউট্রিশন সাময়িকীতে এক পর্যালোচনায় ক্লিনিক্যাল, গবেষণাগার ও প্রাণীর ওপর করা গবেষণার তথ্য একত্র করে জানান, আপেল ও আপেলজাত পণ্যের সঙ্গে ক্যানসার, হৃদ্রোগ, হাঁপানি ও আলঝেইমার্স রোগের ঝুঁকি, সূচক ও কারণের ওপর উপকারী প্রভাবের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
"দিনে একটি আপেল খেলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয় না", ইংরেজির এই পুরোনো প্রবাদটিও পরীক্ষা করে দেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথের গাইজেল স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকেরা, যাঁদের ফল ২০১৫ সালে জামা ইন্টারনাল মেডিসিনে প্রকাশিত হয়। জাতীয় পুষ্টি জরিপে অংশ নেওয়া ৮ হাজার ৩৯৯ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৭৫৩ জন, অর্থাৎ ৯.০ শতাংশ, দিনে অন্তত একটি ছোট আপেল খেতেন। সরাসরি হিসাবে আপেল খাওয়া ব্যক্তিদের ৩৯.০ শতাংশ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এড়াতে পেরেছিলেন, অন্যদের মধ্যে ৩৩.৯ শতাংশ; কিন্তু শিক্ষা, ধূমপান ও অন্যান্য পার্থক্য হিসাবে নেওয়ার পর এই সম্পর্ক আর পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ থাকেনি। তবে আপেল খাওয়া ব্যক্তিরা ব্যবস্থাপত্রের ওষুধ কম ব্যবহার করতেন বলে দেখা যায়। গবেষকদের সিদ্ধান্ত ছিল, দিনে একটি আপেল চিকিৎসককে দূরে রাখে, এমন দাবির পক্ষে প্রমাণ নেই।
ওজন, চিনি ও পেট ভরা থাকা
ওজন নিয়ন্ত্রণে প্রতিবেদনটি আপেলকে কিছুটা এগিয়ে রেখেছিল, আর একটি বড় গবেষণাও একই দিকে ইঙ্গিত করে। হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা তিনটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬৮ জন মার্কিন নারী-পুরুষকে ১৯৮৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত অনুসরণ করেন এবং ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে পিএলওএস মেডিসিনে ফল প্রকাশ করেন। চার বছরের সময়কালে দৈনিক প্রতিটি বাড়তি পরিবেশন ফলের সঙ্গে ০.৫৩ পাউন্ড কম ওজন বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়। বেরির ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ছিল ১.১১ পাউন্ড, আর আপেল ও নাশপাতির ক্ষেত্রে ১.২৪ পাউন্ড। বেশি আঁশ ও কম গ্লাইসেমিক লোডের ফল ও সবজির ক্ষেত্রে সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে জোরালো। গবেষকেরা উল্লেখ করেন, এ ধরনের পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার মতোই অন্য কারণের প্রভাব তাঁরা পুরোপুরি বাদ দিতে পারেননি।
হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স বিষয়টি এভাবে সংক্ষেপ করেছে: ২৪ বছরে সবচেয়ে কম ওজন বাড়ার সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে আপেল ও নাশপাতির, যার সম্ভাব্য কারণ এদের আঁশ ও কম গ্লাইসেমিক লোড; আঁশ ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সাহায্য করতে পারে। ইউএসডিএর হিসাবে ১০০ গ্রাম আপেলে শক্তি ৫২ কিলোক্যালরি, আর ১০০ গ্রাম কলায় ৮৯ কিলোক্যালরি।
কলায় চিনি আছে বলেই এটি এড়িয়ে চলার ফল নয়। নিউট্রিশন সোর্সের তথ্যমতে, পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম, ৫১, আর গ্লাইসেমিক লোড মাঝারি, ১৩; সামান্য কম পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স আরও কম, ৪২, আর লোড ১১। খাবার কত দ্রুত রক্তে গ্লুকোজ বাড়ায়, গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তা মাপে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ মেনে চলার যে কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তা-ই প্রযোজ্য: ডায়াবেটিস থাকলে কতটা ফল, কখন খাওয়া উপযুক্ত, সে প্রশ্নের উত্তর দেবেন রোগীর নিজের চিকিৎসক।
চিনি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সীমা মুক্ত চিনির ক্ষেত্রে। সংস্থাটির সংজ্ঞায় মুক্ত চিনি হলো উৎপাদক, রাঁধুনি বা ভোক্তা যে চিনি খাবার ও পানীয়তে যোগ করেন, এবং মধু, সিরাপ ও ফলের রসে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি। সংস্থাটি বলছে, মুক্ত চিনি মোট শক্তি গ্রহণের ১০ শতাংশের নিচে রাখা উচিত, যা দিনে প্রায় ২ হাজার ক্যালরি খান এমন মানুষের জন্য প্রায় ৫০ গ্রাম, আর ৫ শতাংশ বা তার নিচে নামালে বাড়তি উপকার মিলতে পারে। গোটা তাজা ফল এই সংজ্ঞায় নেই, তবে ফলের রসে চিনি যোগ করা না হলেও তাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুক্ত চিনি থাকে বলে সংস্থাটি জানায়। এনএইচএস ফলের রস, সবজির রস ও স্মুদি মিলিয়ে দিনে ১৫০ মিলিলিটারে সীমিত রাখতে বলে।
কলা: ব্যায়াম ও পরিশ্রমে দ্রুত শক্তি
ব্যায়াম নিয়ে প্রতিবেদনের বক্তব্যটি গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়েছে। ২০১২ সালের মে মাসে পিএলওএস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় অ্যাপালাচিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটির হিউম্যান পারফরম্যান্স ল্যাবরেটরির গবেষকেরা ১৪ জন প্রশিক্ষিত সাইক্লিস্টকে দুবার ৭৫ কিলোমিটারের টাইম ট্রায়ালে চালান: একবার কলা খাইয়ে, আরেকবার ৬ শতাংশ শর্করার স্পোর্টস ড্রিংক খাইয়ে; দুই ক্ষেত্রেই প্রতি ১৫ মিনিটে শরীরের ওজনের প্রতি কিলোগ্রামে ০.২ গ্রাম শর্করা দেওয়া হয়। পারফরম্যান্সে পার্থক্য হয়নি, কলায় ২.৪১ ঘণ্টা আর পানীয়তে ২.৩৬ ঘণ্টা; রক্তের গ্লুকোজ, প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও রোগ প্রতিরোধসংক্রান্ত সূচকও ছিল প্রায় একই রকম। গবেষণাপত্রে ঘোষণা দেওয়া আছে, গবেষণাটির অর্থায়নের একটি অংশ দিয়েছিল ডোল ফুডস, আর এর দুজন বিজ্ঞানী ডোল নিউট্রিশন রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে কাজ করতেন।
এই শক্তি আসে কলার শর্করা থেকে। ইউএসডিএর হিসাবে পাকা কলার চিনিতে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ প্রায় সমান, সঙ্গে কিছু সুক্রোজ, আর এতে তখনো কিছু শ্বেতসার থাকে। কলা পাকার সময় ইথিলিন নামের উদ্ভিদ হরমোন অ্যামাইলেজ নামের একটি এনজাইম তৈরিতে উদ্দীপনা দেয়, যা শ্বেতসার ভেঙে চিনিতে পরিণত করে; এ কারণেই কাঁচা কলা খেতে শ্বেতসারের মতো আর পাকা কলা মিষ্টি। হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স জানায়, কাঁচা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ থাকে, এমন এক শর্করা যা ক্ষুদ্রান্ত্রে হজম হয় না। ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়ার গবেষকদের করা এবং ২০১৯ সালের মে মাসে নিউট্রিয়েন্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত কাঁচা কলার আটা ও শাঁস নিয়ে ১৮টি গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরীক্ষিত উপকারিতার বেশির ভাগ পরিপাকতন্ত্রের উপসর্গসংক্রান্ত, এরপর রক্তের গ্লুকোজ ও ইনসুলিন, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ডায়াবেটিসের জটিলতা; গবেষকেরা নির্দিষ্ট মাত্রা নির্ধারণ ও আরও গবেষণার প্রয়োজনের কথা বলেন।
কলায় ভিটামিন বি৬-ও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট মেডলাইনপ্লাস এই ভিটামিনের খাদ্য উৎসের তালিকায় কলা রেখেছে এবং জানিয়েছে, ভিটামিনটি শরীরকে অ্যান্টিবডি ও হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে, স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজ বজায় রাখতে, আমিষ ভাঙতে ও রক্তে চিনির মাত্রা স্বাভাবিক সীমায় রাখতে সাহায্য করে। ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এর দৈনিক প্রস্তাবিত পরিমাণ ১.৩ মিলিগ্রাম, ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের জন্য ১.৭ মিলিগ্রাম ও নারীদের জন্য ১.৫ মিলিগ্রাম।

পটাশিয়াম, রক্তচাপ এবং কাদের সাবধান থাকতে হবে
কলার সবচেয়ে পরিচিত পুষ্টি উপাদান পটাশিয়াম। এনআইএইচের অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টস জানায়, শরীরের সব টিস্যুতে পটাশিয়াম থাকে এবং কোষের স্বাভাবিক কাজের জন্য এটি দরকার; কোষের ভেতরে ও বাইরে এর ঘনত্বের পার্থক্য স্নায়ুর সংকেত পরিবহন, পেশির সংকোচন ও কিডনির কাজের জন্য প্রয়োজন। এতে পেশি নিয়ে প্রতিবেদনের বক্তব্যের সমর্থন মেলে। এনআইএইচ ১৯ বছর ও তার বেশি বয়সী পুরুষদের জন্য দিনে ৩ হাজার ৪০০ মিলিগ্রাম এবং নারীদের জন্য ২ হাজার ৬০০ মিলিগ্রাম পর্যাপ্ত গ্রহণমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর খাদ্য উৎসের তালিকায় মাঝারি আকারের একটি কলায় ৪২২ মিলিগ্রাম এবং খোসাসহ মাঝারি আকারের একটি আপেলে ১৯৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম দেখানো হয়েছে। সেঁকা আলু, এক কাপ কমলার রস ও কয়েক ধরনের শিমে কলার চেয়েও বেশি পটাশিয়াম থাকে।
রক্তচাপ প্রসঙ্গে এনআইএইচ বলছে, বিপুল গবেষণায় দেখা গেছে, কম পটাশিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে সঙ্গে বেশি সোডিয়াম থাকলে, আর বেশি পটাশিয়াম রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। ফল, সবজি ও কম চর্বির দুগ্ধজাত খাবার থেকে প্রচুর পটাশিয়ামসমৃদ্ধ ড্যাশ খাদ্যাভ্যাসে সিস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ৫.৫ এমএমএইচজি ও ডায়াস্টোলিক ৩.০ এমএমএইচজি কমেছে, যদিও এতে ম্যাগনেসিয়াম ও ক্যালসিয়ামও বাড়ে বলে শুধু পটাশিয়ামের অবদান আলাদা করা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে অন্তত ৯০ মিলিমোল বা ৩ হাজার ৫১০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম গ্রহণ উপকারী হতে পারে, পটাশিয়াম রক্তচাপের ওপর সোডিয়ামের প্রভাবের কিছুটা প্রশমিত করতে পারে, তাজা ফল ও সবজি খেলে পটাশিয়াম গ্রহণ বাড়ে, আর প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়া উচিত।
তবে একটি দলের জন্য বেশি পটাশিয়াম মানেই ভালো নয়। এনআইএইচ জানায়, কোনো রোগের কারণে যাঁদের শরীর স্বাভাবিকভাবে পটাশিয়াম বের করে দিতে পারে না, তাঁদের ক্ষেত্রে এই গ্রহণমাত্রা প্রযোজ্য নয়। কিডনি রোগ ও কিছু ওষুধের কারণে হাইপারক্যালেমিয়া হতে পারে, অর্থাৎ রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা প্রতি লিটারে ৫.০ মিলিমোলের বেশি হয়ে যেতে পারে। এনআইএইচের উল্লেখ করা ওষুধের মধ্যে আছে উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিওরের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এসিই ইনহিবিটর ও অ্যানজিওটেনসিন রিসেপ্টর ব্লকার এবং পটাশিয়াম-সংরক্ষণকারী মূত্রবর্ধক ওষুধ; এসব ওষুধ যাঁরা খান, তাঁদের পটাশিয়াম গ্রহণ নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করতে বলা হয়েছে। তাই কিডনি রোগ থাকলে বা এ ধরনের ওষুধ খেলে কতটা কলা বা অন্য পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার নিরাপদ, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।
দুই ফলের দুই ইতিহাস: বিশ্বে ও বাংলাদেশে
ফল দুটি আসে একেবারে ভিন্ন ধরনের গাছ থেকে। কলা হয় মুসা গণের বড়, গাছের মতো দেখতে বীরুৎ উদ্ভিদে, আর খাওয়ার উপযোগী প্রায় সব কলার উৎপত্তি দুটি বুনো প্রজাতি, মুসা অ্যাকুমিনাটা ও মুসা বালবিসিয়ানা, অথবা এদের সংকর থেকে। কলা সম্ভবত প্রথম গৃহপালিত হয় নিউগিনিতে, যেখানে কুক সোয়াম্প প্রত্নস্থলে পাওয়া নিদর্শনের বয়স নির্ধারিত হয়েছে বর্তমান থেকে প্রায় ১০ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার বছর আগে; আজ ১৩৫টি দেশে কলা চাষ হয়। বিশ্ববাজারে ক্যাভেন্ডিশ গোষ্ঠীর জাতগুলোর আধিপত্য। অন্যদিকে আপেল (মালুস ডোমেস্টিকা) একটি বৃক্ষ, যার উৎপত্তি মধ্য এশিয়ায়, যেখানে এর বুনো পূর্বপুরুষ মালুস সিয়েভারসিই এখনো জন্মায়; আপেলের ৭ হাজার ৫০০টির বেশি জাত আছে, যেগুলো রুটস্টকে কলম করে বংশবিস্তার করা হয়, আর নিয়ন্ত্রিত বায়ুমণ্ডলের হিমাগারে আপেল মাসের পর মাস সংরক্ষণ করা যায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যান তথ্যভান্ডার ফাওস্ট্যাটের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রকাশনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি ৯৪ লাখ টন কলা এবং প্রায় ৯ কোটি ৭৯ লাখ টন আপেল উৎপাদিত হয়। সবচেয়ে বেশি কলা উৎপাদন করে ভারত, প্রায় ৩ কোটি ৭৬ লাখ টন, আর সবচেয়ে বেশি আপেল উৎপাদন করে মূল ভূখণ্ড চীন, প্রায় ৫ কোটি ১৩ লাখ টন।
বাংলাদেশে কলা ঘরের ফসল। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশের প্রায় সব জায়গায় সারা বছর কলা জন্মায়; প্রধান চাষ এলাকা রাঙামাটি, বরিশাল, রংপুর, দিনাজপুর, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও খুলনা, আর জনপ্রিয় স্থানীয় জাতের মধ্যে আছে সাগর, চাঁপা, সবরি, সিঙ্গাপুরি ও মেহেরসাগর; কাঁচকলা জাতীয় রান্নার কলা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। ফাওস্ট্যাটের হিসাবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৪৯ হাজার ৭২০ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৮ লাখ ১৩ হাজার ৫৬০ টন কলা উৎপাদিত হয়, ২০২৩ সালে যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার ৩৬২ টন।
আপেল অবশ্য মূলত আমদানিনির্ভর। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার ইউএসডিএর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২ লাখ ৭১ হাজার টন আপেল আমদানি করে, যা রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ; সবচেয়ে বড় উৎস চীন, এরপর ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, উচ্চ তাপমাত্রা ও স্বল্পস্থায়ী শীতের কারণে দেশে আপেল চাষের চেষ্টায় এখনো মানসম্পন্ন ফল পাওয়া যায়নি। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলো জানায়, আগের অর্থবছরে দেশে ৬ লাখ ১৬ হাজার টন ফল আমদানি হয়েছিল, যার ৭৭ শতাংশ আপেল ও মাল্টা।

দামেও এই পার্থক্য দেখা যায়, যা কলাকে সাশ্রয়ী বলার পক্ষে সমর্থন দেয়। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে আমদানি করা ফলের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর পর সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, চীনা ফুজি আপেল বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায় এবং সবুজ আপেল ৪৭০ টাকায়, আর কলা ডজনপ্রতি ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। পত্রিকাটির হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দফা বাড়ানোর পর আমদানি করা ফলের ওপর মোট শুল্ক দাঁড়ায় ১৩৬.২০ শতাংশ।
ঠিকভাবে রাখলে দুটি ফলই ভালো থাকে। হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্সের পরামর্শ, কলা পাকাতে বাদামি কাগজের ঠোঙায় বা পাকা ফলের পাশে রাখুন, কারণ পাকা ফল ইথিলিন গ্যাস ছাড়ে; কাঁচা কলা ফ্রিজে রাখবেন না, কারণ ঠান্ডায় পাকার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়; পুরো পাকা কলা ফ্রিজে রাখলে আরও প্রায় এক সপ্তাহ ভালো থাকে। আপেল ঘরের তাপমাত্রায় প্রায় এক থেকে দুই সপ্তাহ এবং ফ্রিজের সবজি রাখার ড্রয়ারে অন্তত এক থেকে দুই মাস ভালো থাকে; তবে অন্য ফল ও সবজি থেকে আলাদা রাখতে হয়, কারণ আপেল থেকে বের হওয়া ইথিলিন অন্য ফলকে দ্রুত পাকিয়ে দেয়।

খাদ্য নির্দেশিকা কেন একটি ফলের বদলে বৈচিত্র্যের কথা বলে
প্রতিদিন একই ফল না খেয়ে সপ্তাহজুড়ে নানা ফল খাওয়ার যে পরামর্শ দিয়ে প্রতিবেদনটি শেষ হয়েছিল, তা খাদ্য নির্দেশিকাগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক ফ্যাক্টশিটে, যার তারিখ ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি, পর্যাপ্ততা, ভারসাম্য, পরিমিতি ও বৈচিত্র্যকে যেকোনো স্বাস্থ্যকর খাদ্যের চারটি মূল নীতি বলা হয়েছে এবং নানা ধরনের ফল, সবজি, ডাল, গোটা শস্য ও কম চর্বির আমিষের উৎস খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১০ বছরের বেশি বয়সী সবার দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও সবজি খাওয়ার লক্ষ্য রাখা উচিত; ২ থেকে ৫ বছরের শিশুদের জন্য অন্তত ২৫০ গ্রাম এবং ৬ থেকে ৯ বছরের শিশুদের জন্য ৩৫০ গ্রাম; তাজা ফল ও সবজি খুব ভালো পছন্দ, তবে হিমায়িত ও টিনজাত ফল-সবজিও ভালো।
এনএইচএস এই ৪০০ গ্রামকে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৮০ গ্রামের পাঁচটি পরিবেশনে ভাগ করেছে এবং একটি আপেল বা একটি কলাকে এক পরিবেশন হিসেবে গণ্য করে; শুকনো ফলের এক পরিবেশন প্রায় ৩০ গ্রাম। এই হিসাবে দিনে একটি আপেল বা কলা পাঁচ পরিবেশনের একটি, পুরোটা নয়।
বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্যভিত্তিক পুষ্টি নির্দেশিকাও একই কথা বলে। ২০০০ সালে বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ এটি প্রকাশ করে এবং ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডারসের (বারডেম) মাধ্যমে তা হালনাগাদ করা হয়। এর খাদ্য পিরামিডে ভাত, রুটি ও অন্যান্য শস্যের ঠিক ওপরে দ্বিতীয় স্তরে রাখা হয়েছে সবজি ও ফল, যা পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়ার কথা। নির্দেশিকার প্রথম বার্তা হলো প্রতি বেলায় নানা ধরনের খাবার দিয়ে সুষম খাদ্য গ্রহণ; সঙ্গে আছে চিনি, মিষ্টি ও মিষ্টি পানীয় কম খাওয়া এবং সুষম খাদ্য ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ওজন বজায় রাখার পরামর্শ। এই পরামর্শ অনুযায়ী কলা ও আপেল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং বাংলাদেশের পেয়ারা, পেঁপে, আম ও অন্যান্য মৌসুমি ফলের পাশে খাদ্যতালিকার অংশ।
ছবি: nlitement / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ফুডডেটা সেন্ট্রাল), যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টস, মেডলাইনপ্লাস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এনএইচএস, হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ (দ্য নিউট্রিশন সোর্স), আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন, জামা ইন্টারনাল মেডিসিন, পিএলওএস মেডিসিন, পিএলওএস ওয়ান, অ্যাডভান্সেস ইন নিউট্রিশন, নিউট্রিয়েন্টস, এফএও (ফাওস্ট্যাট ও খাদ্যভিত্তিক পুষ্টি নির্দেশিকা), বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)