সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

সকালে কিশমিশ খাওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো: গবেষণা ও স্বাস্থ্য সংস্থা যা বলে

সকালে ভেজানো কিশমিশ খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জাগো নিউজের প্রতিবেদন বলেছিল, এতে কিছু বাস্তব উপকার আছে, তবে ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ ও আইবিএস থাকলে সতর্কতা জরুরি; ইউএসডিএ, এনএইচএস, এনআইএইচ ও ক্লিনিক্যাল গবেষণার তথ্যে সেই দাবিগুলো যাচাই করা হলো।

সকালে কিশমিশ খাওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো: গবেষণা ও স্বাস্থ্য সংস্থা যা বলে
ফল

২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি জাগো নিউজ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক এমন একটি প্রশ্ন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার উত্তর বাংলাদেশের অনেক পরিবারের দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গে জড়িত: সকালে খালি পেটে কয়েকটি ভেজানো কিশমিশ খাওয়া কি সত্যিই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো? কেউ বলেন এতে হজম ভালো থাকে, কেউ বলেন রক্তস্বল্পতা কমে, আবার কেউ একে ত্বকের জন্য প্রাকৃতিক টনিক মনে করেন। প্রতিবেদনটি সূত্র হিসেবে হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল এবং যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) উল্লেখ করে। এর মূল কথা ছিল, পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সকালে কিশমিশ খাওয়ার কিছু বাস্তব উপকারিতা আছে, তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সতর্কতাও জরুরি।

প্রতিবেদনের উপসংহার ছিল সংযত। সুস্থ মানুষের জন্য সকালে ভেজানো কিশমিশ উপকারী হতে পারে, যদি পরিমাণ কম ও নিয়মিত হয়; তবে কিশমিশ কোনো ম্যাজিক ফুড নয়, আর নিজের শরীরের অবস্থা ও প্রয়োজন বুঝে একে খাদ্যতালিকায় রাখাই উচিত। এই লেখায় প্রতিবেদনের প্রতিটি দাবি সেই সময় পর্যন্ত প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে: ইউএসডিএর পুষ্টি-উপাত্ত, এনএইচএস, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা এবং কিশমিশ নিয়ে প্রকাশিত ক্লিনিক্যাল গবেষণা। এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা-পরামর্শ নয়। ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, রক্তস্বল্পতা বা দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা থাকলে খাদ্যাভ্যাস বদলানোর আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।

কিশমিশ কী


কিশমিশ হলো শুকনো আঙুর, যা মূলত সাধারণ আঙুরলতা ভাইটিস ভিনিফেরার (Vitis vinifera) বিভিন্ন জাত থেকে তৈরি হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নিউট্রিয়েন্টস সাময়িকীতে স্পেনের বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয় ও চিলির কনসেপসিওন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা 'কিশমিশ খাওয়া কি স্বাস্থ্যকর?' শিরোনামে একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করেন; সেখানে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। আঙুরের জাত, রং ও আকারের ওপর কিশমিশের ধরন নির্ভর করে। পর্যালোচনায় সবচেয়ে প্রচলিত ধরনগুলোর উল্লেখ আছে: কালো কিশমিশ, যা সাধারণত থম্পসন সিডলেস আঙুর থেকে তৈরি হয়; সোনালি কিশমিশ, যা সাধারণত সাদা মাসকাট আঙুর থেকে তৈরি হয়; সুলতানা, যা বিচিহীন হলুদ আঙুর থেকে আসে এবং সাধারণত অন্যগুলোর চেয়ে মিষ্টি ও নরম; আর জান্টে কারেন্ট বা করিন্থিয়ান কিশমিশ, যা ছোট কালো করিন্থ আঙুর থেকে তৈরি হয়।

রঙের পার্থক্যের একটি অংশ আসে প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে। সোনালি কিশমিশ শুধু শুকিয়ে নয়, সালফার ডাই-অক্সাইড দিয়ে প্রক্রিয়া করে তৈরি হয় এবং কখনো কখনো নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ডিহাইড্রেটরে শুকানো হয়। কালো করিন্থ বা জান্টে কারেন্ট ছোট, গাঢ় রঙের ও টক-মিষ্টি স্বাদের, আর মাসকাট কিশমিশ অন্য বেশির ভাগ জাতের চেয়ে বড় ও মিষ্টি। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় মোনাক্কা নামের বড় কালো আঙুর থেকেও বড় আকারের কিশমিশ তৈরি হয়।

বিশ্বের অনেক অঞ্চলে কিশমিশ উৎপাদিত হয়; এটি সরাসরি খাওয়া হয়, আবার রান্না ও বেকিংয়েও ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক বাদাম ও শুকনো ফল পরিষদের (ইন্টারন্যাশনাল নাট অ্যান্ড ড্রায়েড ফ্রুট কাউন্সিল) হিসাবে ২০২৩-২৪ মৌসুমে বিশ্বে কিশমিশ, সুলতানা ও কারেন্টের আনুমানিক উৎপাদন ছিল ১১ লাখ টন; শীর্ষ উৎপাদক দেশ তুরস্ক, চীন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।

থম্পসন সিডলেস (সুলতানা) আঙুর, বেশির ভাগ কালো কিশমিশ এই জাত থেকে তৈরি হয়। ছবি: Glane23 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
থম্পসন সিডলেস (সুলতানা) আঙুর, বেশির ভাগ কালো কিশমিশ এই জাত থেকে তৈরি হয়। ছবি: Glane23 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

আঙুর যেভাবে কিশমিশ হয়


আঙুর শুকানো যতটা সহজ মনে হয়, ততটা নয়। ফলের ভেতরের পানিকে কোষ থেকে বেরিয়ে পৃষ্ঠে আসতে হয়, তবেই তা বাষ্প হয়ে উড়ে যায়; কিন্তু আঙুরের খোসায় মোমজাতীয় একটি আবরণ (কিউটিকল) থাকে, যা পানি আটকে রাখে। তাই বাণিজ্যিকভাবে কিশমিশ তৈরির তিনটি ধাপ: প্রাক-প্রক্রিয়া, শুকানো এবং শুকানোর পরের প্রক্রিয়াজাতকরণ।

প্রাক-প্রক্রিয়ায় পানি বের হওয়ার গতি বাড়ানো হয়; দ্রুত শুকালে বাদামি হয়ে যাওয়া কমে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও এশিয়া মাইনরে উদ্ভাবিত প্রচলিত পদ্ধতিতে পটাশিয়াম কার্বোনেট ও ফ্যাটি অ্যাসিডের ইথাইল এস্টারের ঠান্ডা দ্রবণে আঙুর ডোবানো হতো, এতে পানি হারানোর হার দুই থেকে তিন গুণ বাড়ত। নতুন পদ্ধতিতে আঙুরকে তেলের ইমালশন বা পাতলা ক্ষারীয় দ্রবণের সংস্পর্শে আনা হয়। এরপর আঙুর রোদে, ছায়ায় বা যন্ত্রে শুকানো হয়। রোদে শুকানো সস্তা, তবে এতে ধুলাবালি, পোকামাকড় ও জীবাণুর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে; যন্ত্রে শুকানো, যার মধ্যে মাইক্রোওয়েভে শুকিয়ে ফোলা কিশমিশ তৈরিও আছে, দ্রুত ও বেশি নিয়ন্ত্রিত। শুকানোর পর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় কিশমিশ পানিতে ধোয়া হয়, বোঁটা ও নিম্নমানের দানা বাদ দেওয়া হয় এবং ধোয়ার সময় শোষিত আর্দ্রতা দূর করতে আবার শুকানো হয়। বাদামি হয়ে যাওয়া ধীর করতে এবং স্বাদ ও কিছু ভিটামিন রক্ষা করতে কখনো কখনো শুকানোর আগে সালফার ডাই-অক্সাইড প্রয়োগ করা হয়।

শুকানোর ফলে ফলের উপাদানেও পরিবর্তন আসে। নিউট্রিয়েন্টস সাময়িকীর পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, শুকানোর প্রক্রিয়ায় আঙুরের চিনির একটি অংশ ফ্রুক্টান নামের এক ধরনের আঁশে রূপ নেয়: তাজা আঙুরে ফ্রুক্টান শনাক্ত করা যায় না, কিন্তু কিশমিশে এর পরিমাণ ৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। পর্যালোচনায় একটি নিরাপত্তা-উদ্বেগের কথাও আছে। আঙুর শুকানোর সময় আবহাওয়া আর্দ্র হলে অ্যাসপারজিলাস ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে, যা ওক্রাটক্সিন এ নামের বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে। ইউরোপীয় কমিশন শুকনো আঙুরজাত ফলে ওক্রাটক্সিন এ-এর সর্বোচ্চ মাত্রা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম নির্ধারণ করেছে। কয়েকটি গবেষণায় কিশমিশে এর মাত্রা সীমার নিচে পাওয়া গেছে, আবার কিছু গবেষণায় সীমার বেশি মাত্রার নমুনাও মিলেছে; পর্যালোচনায় উদ্ধৃত একটি গবেষণার হিসাবে কিশমিশ খেয়ে তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়ার ঝুঁকি ছিল খুবই কম।

কিশমিশ তৈরির জন্য রোদে শুকানো হচ্ছে আঙুর, গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের নোসোসের কাছে। ছবি: Martin Budweg / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
কিশমিশ তৈরির জন্য রোদে শুকানো হচ্ছে আঙুর, গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের নোসোসের কাছে। ছবি: Martin Budweg / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

১০০ গ্রাম কিশমিশে যা থাকে


জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শুকানোর ফলে আঙুরের প্রাকৃতিক শর্করা, আঁশ, আয়রন, পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ঘনত্ব বেড়ে যায়। ইউএসডিএর ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডারের (২০১৯ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এসআর লিগেসি সংস্করণ) উপাত্তে এর পরিমাণ পাওয়া যায়। সেখানে ১০০ গ্রাম কালো বিচিহীন কিশমিশে প্রায় ১৫.৫ গ্রাম পানি, ২৯৯ কিলোক্যালরি শক্তি এবং ৭৯.৩ গ্রাম শর্করা দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে ৬৫.২ গ্রাম চিনি ও ৪.৫ গ্রাম খাদ্য-আঁশ। একই পরিমাণে প্রোটিন ৩.৩ গ্রাম, আর চর্বি মাত্র ০.২৫ গ্রাম। খনিজ ও ভিটামিনের মধ্যে ১০০ গ্রাম কালো কিশমিশে আছে ৭৪৪ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ১.৭৯ মিলিগ্রাম আয়রন, ৬২ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩৬ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, ৯৮ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ২৬ মিলিগ্রাম সোডিয়াম এবং ২.৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি।

সোনালি কিশমিশও বেশির ভাগ দিক থেকে কাছাকাছি। ইউএসডিএর একই উপাত্ত ব্যবহার করে নিউট্রিয়েন্টস পর্যালোচনায় ১০০ গ্রাম সোনালি কিশমিশে ৩০১ কিলোক্যালরি, ৬৫.৭ গ্রাম চিনি, ৩.৩ গ্রাম আঁশ, ৭৪৬ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও ০.৯৮ মিলিগ্রাম আয়রনের কথা বলা হয়েছে।

কিশমিশের চিনির প্রায় সবটাই গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ। ইউএসডিএর হিসাবে ১০০ গ্রাম কালো কিশমিশে ৩৪.৭ গ্রাম ফ্রুক্টোজ ও ৩০.৫ গ্রাম গ্লুকোজ আছে, সুক্রোজ পরিমাপযোগ্য মাত্রায় নেই। পর্যালোচনায় কিশমিশকে প্রায় ৬০ শতাংশ চিনি বলে বর্ণনা করে উল্লেখ করা হয়েছে, এ কারণেই অনেকে একে অস্বাস্থ্যকর মনে করেন, যদিও এতে প্রচুর আঁশ ও উদ্ভিজ্জ যৌগও আছে।

মূল প্রতিবেদনে যাকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বলা হয়েছে, সেগুলো এই উদ্ভিজ্জ যৌগ। পর্যালোচনায় কিশমিশের প্রধান পলিফেনল হিসেবে ফেনোলিক অ্যাসিড (ক্যাফটারিক ও কুটারিক অ্যাসিড) এবং ফ্লাভোনল (কোয়ারসেটিন ও কেম্পফেরলের গ্লাইকোসাইড এবং রুটিন) উল্লেখ করা হয়েছে; সঙ্গে আছে অ্যান্থোসায়ানিন, ওলিয়ানোলিক অ্যাসিডের মতো ট্রাইটারপেনয়েড এবং টারটারিক অ্যাসিড। জাতভেদে এর পরিমাণ অনেক আলাদা: পর্যালোচনায় উদ্ধৃত একটি তুলনায় লাল কিশমিশে মোট ফেনোলিক যৌগ সবচেয়ে বেশি এবং সাদা কিশমিশে সবচেয়ে কম পাওয়া যায়।

যুক্তিসংগত পরিমাণটি ছোট। এনএইচএস প্রায় ৩০ গ্রাম শুকনো ফলকে, যা তাদের বর্ণনায় মোটামুটি এক টেবিল চামচ ভরা কিশমিশ, কারেন্ট বা সুলতানা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিনের পাঁচ পোর্শন ফল ও সবজির এক পোর্শন হিসেবে গণ্য করে। একই নির্দেশনায় সংস্থাটি যোগ করেছে, শুকনো ফলে চিনি বেশি থাকতে পারে এবং তা দাঁতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

কালো কিশমিশ। ছবি: Paweł Kuźniar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
কালো কিশমিশ। ছবি: Paweł Kuźniar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

হজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য


জাগো নিউজের প্রতিবেদনে কিশমিশকে হজমের বন্ধু বলা হয়েছিল: এর খাদ্য-আঁশ অন্ত্রের গতিশীলতা বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। আঁশ ও ফল নিয়ে সাধারণ এই কথার পক্ষে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সমর্থন আছে। এনএইচএসের তালিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে আছে ফল, সবজি ও শস্যে থাকা আঁশ যথেষ্ট না খাওয়া এবং যথেষ্ট তরল পান না করা। মল নরম করতে সংস্থাটির পরামর্শ হলো স্বাস্থ্যকর সুষম খাবার খাওয়া এবং তাতে সরবিটলযুক্ত ফল রাখা, যেমন আপেল, অ্যাপ্রিকট, আঙুর (ও কিশমিশ), রাস্পবেরি ও স্ট্রবেরি; প্রচুর পানি ও অন্যান্য তরল পান করা; এবং ধীরে ধীরে আঁশের পরিমাণ বাড়ানো, যেমন গমের ভুসি, ওটস বা তিসি খাবারে যোগ করা।

হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের 'দ্য নিউট্রিশন সোর্স' জানায়, সুস্বাস্থ্যের জন্য শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে অন্তত ২৫ থেকে ৩৫ গ্রাম আঁশ দরকার, অথচ বেশির ভাগ আমেরিকান পান মাত্র প্রায় ১৫ গ্রাম। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, দ্রবণীয় আঁশ পানিতে গলে যায় এবং রক্তের গ্লুকোজ ও কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করতে পারে, আর অদ্রবণীয় আঁশ খাবারকে পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে এগোতে সাহায্য করে ও কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। ২০১১ সালে জার্নাল অব মেডিসিনাল ফুডে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কিশমিশে দুই ধরনের আঁশই আছে।

দুটি ছোট গবেষণায় সরাসরি কিশমিশ পরীক্ষা করা হয়। ২০০৩ সালে প্রকাশিত একটি মাত্রাভিত্তিক গবেষণায় ১৬ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক দিনে ৮৪, ১২৬ ও ১৬৮ গ্রাম রোদে শুকানো কিশমিশ খান, প্রতিটি পরিমাণ দুই সপ্তাহ করে। তাঁদের মলের ওজন কিশমিশ ছাড়া দিনে ১৬৮ গ্রাম থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণে দিনে ২০০ গ্রামে ওঠে, আর খাবার অন্ত্র পেরোতে যে সময় লাগে, তা ৫৪ ঘণ্টা থেকে কমে ৪২ ঘণ্টা হয়। দিনে ৮৪ গ্রামে এই সময় কমে ৪৪ ঘণ্টা হয়; গবেষকেরা পরিবর্তনটিকে শারীরবৃত্তীয়ভাবে অর্থবহ বললেও তা পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না। এই পর্যায়ে মলে পিত্ত-অম্লের মাত্রা প্রতি গ্রামে ১.০০ থেকে কমে ০.৩৮ মিলিগ্রাম হয়। দ্বিতীয় গবেষণায় ১৩ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক দিনে ১২০ গ্রাম রোদে শুকানো কিশমিশ অথবা ৫ গ্রাম ক্রিম অব টারটার খান; ওই পরিমাণ কিশমিশে যতটা টারটারিক অ্যাসিড থাকে, ক্রিম অব টারটারে ছিল ততটাই। কিশমিশ খাওয়ার সময় অন্ত্র পেরোনোর সময় ৪২ ঘণ্টা থেকে কমে ২৮ ঘণ্টা হয়, মল নরম হয়; গবেষকেরা এর কৃতিত্ব দেন আঁশ ও টারটারিক অ্যাসিড দুটিকেই।

এসব গবেষণায় এনএইচএসের প্রায় ৩০ গ্রামের পোর্শনের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ কিশমিশ ব্যবহার করা হয়েছে, আর ২০১৯ সালের পর্যালোচনা সতর্ক করেছে, বৃহদন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা দরকার। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা আরও প্রাথমিক পর্যায়ে। একটি পরীক্ষাগার-মডেলে কিশমিশ উপকারী বাইফিডোব্যাকটেরিয়া ও ল্যাক্টোব্যাসিলাস বাড়িয়েছে; আর পর্যালোচনায় বর্ণিত একমাত্র মানবগবেষণায় সুস্থ মানুষ ১৪ দিন ধরে দিনে তিনবার ২৮.৩ গ্রাম করে রোদে শুকানো কিশমিশ খেলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার সামগ্রিক বৈচিত্র্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি, যদিও কিছু ব্যাকটেরিয়া-গোষ্ঠী বেড়েছে বা কমেছে এবং শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড উৎপাদন বেড়েছে। চিকিৎসায় কোষ্ঠকাঠিন্য না সারলে, মলের সঙ্গে রক্ত গেলে, চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমলে বা পেটে ব্যথা হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয় এনএইচএস।

আয়রন ও রক্তস্বল্পতা


প্রতিবেদনে বর্ণিত দ্বিতীয় উপকারিতা ছিল হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা। সেখানে বলা হয়, কিশমিশে উদ্ভিজ্জ আয়রন থাকে, যা নিয়মিত খেলে রক্তস্বল্পতা বা আয়রনের ঘাটতিতে ভোগা মানুষের উপকার হতে পারে, আর ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে খেলে আয়রন শোষণ আরও ভালো হয়। এই অঞ্চলে রক্তস্বল্পতা বড় সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির ফ্যাক্টশিট অনুযায়ী, বিশ্বে আনুমানিক ৪০ শতাংশ শিশু (৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী), ৩৭ শতাংশ গর্ভবতী নারী এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৩০ শতাংশ নারী রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। বাংলাদেশ যে অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, ডব্লিউএইচওর সেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে আনুমানিক ২৪ কোটি ৪০ লাখ নারী ও ৮ কোটি ৩০ লাখ শিশু রক্তস্বল্পতায় ভুগছে।

ডব্লিউএইচও বলছে, প্রধানত খাবারে আয়রন কম থাকার ফলে তৈরি আয়রন-ঘাটতিই রক্তস্বল্পতার সবচেয়ে সাধারণ পুষ্টিজনিত কারণ। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়: ভিটামিন এ, ফোলেট, ভিটামিন বি১২ ও রাইবোফ্লাভিনের ঘাটতি, ম্যালেরিয়া ও পরজীবী কৃমির মতো সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো বংশগত লোহিত রক্তকণিকার রোগ থেকেও রক্তস্বল্পতা হতে পারে। এ কারণে সংস্থাটি বলছে, চিকিৎসা নির্ভর করে মূল কারণের ওপর, এবং ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ থাকলে শুরুতেই স্বাস্থ্যসেবাদাতার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেয়।

এনআইএইচের ভোক্তা-স্বাস্থ্যসেবা মেডলাইনপ্লাস জানায়, লোহিত রক্তকণিকার অক্সিজেন বহনকারী প্রোটিন হিমোগ্লোবিন তৈরিতে শরীরের আয়রন দরকার; উদ্ভিজ্জ আয়রনের উৎস হিসেবে সেখানে শুকনো ফলের তালিকায় প্রুন, কিশমিশ ও অ্যাপ্রিকটের নাম আছে। তবে সবজি, ফল ও শস্যের আয়রন শরীর তুলনামূলক কম শোষণ করতে পারে। ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার, যেমন লেবুজাতীয় ফল, স্ট্রবেরি, টমেটো ও আলু, আয়রন শোষণ বাড়ায়; আর ডাল-বিন বা গাঢ় সবুজ শাকের সঙ্গে কিছু চর্বিহীন মাংস, মাছ বা মুরগি খেলে উদ্ভিজ্জ আয়রনের শোষণ তিন গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে কালো চায়ে এমন উপাদান আছে, যা আয়রনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শরীরের ব্যবহারের অযোগ্য করে তোলে। ডব্লিউএইচওর পরামর্শও একই রকম: চর্বিহীন লাল মাংস, মাছ, মুরগি, মসুর ডাল ও শিম, আয়রন-সমৃদ্ধ সিরিয়াল এবং গাঢ় সবুজ শাকের মতো আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া; ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া; এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে চা, কফি, কোকো ও ক্যালসিয়াম এড়িয়ে চলা।

পরিমাণের হিসাবেই কিশমিশের ভূমিকা বোঝা যায়। ইউএসডিএ অনুযায়ী ১০০ গ্রাম কালো কিশমিশে আয়রন ১.৭৯ মিলিগ্রাম। মেডলাইনপ্লাসের তালিকায় দৈনিক প্রস্তাবিত পরিমাণ ১৯ বছর ও তার বেশি বয়সী পুরুষের জন্য ৮ মিলিগ্রাম, ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীর জন্য ১৮ মিলিগ্রাম এবং গর্ভবতী নারীর জন্য ২৭ মিলিগ্রাম। বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকায় কিশমিশ কিছু আয়রন যোগ করতে পারে, তবে রক্তস্বল্পতার উপসর্গ থাকলে ডব্লিউএইচওর পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবাদাতার কাছে যাওয়া উচিত, কারণ সঠিক চিকিৎসা কারণের ওপর নির্ভর করে।

পটাশিয়াম, রক্তচাপ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট


প্রতিবেদনের তৃতীয় বক্তব্য ছিল, কিশমিশের পটাশিয়াম শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এনআইএইচের অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টস (ওডিএস) পটাশিয়ামের ভালো খাদ্য-উৎসের তালিকায় কিশমিশ রেখেছে: আধা কাপ কিশমিশে ৬১৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে, যা শুকনো প্রুনের (৬৩৫ মিলিগ্রাম) ও শুকনো অ্যাপ্রিকটের (৭৫৫ মিলিগ্রাম) কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমিস নির্ধারিত পর্যাপ্ত গ্রহণমাত্রা ১৯ বছর ও তার বেশি বয়সী পুরুষের জন্য দিনে ৩,৪০০ মিলিগ্রাম এবং নারীর জন্য ২,৬০০ মিলিগ্রাম। ওডিএস ব্যাখ্যা করেছে, কিডনি পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রণ করে রক্তে এর মাত্রা সাধারণত প্রতি লিটারে প্রায় ৩.৬ থেকে ৫.০ মিলিমোলের মধ্যে রাখে, এবং বেশি পটাশিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে, আংশিকভাবে রক্তনালি প্রসারিত করে ও প্রস্রাবের সঙ্গে সোডিয়াম বের হওয়া বাড়িয়ে। ফল, সবজি ও কম চর্বির দুগ্ধজাত খাবার থেকে পটাশিয়ামের ওপর জোর দেওয়া ড্যাশ খাদ্যাভ্যাস সিস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ৫.৫ মিমি পারদ এবং ডায়াস্টোলিক চাপ ৩.০ মিমি পারদ কমায়।

কয়েকটি গবেষণায় সরাসরি কিশমিশ পরীক্ষা করা হয়েছে। ২০১৪ সালে পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত ১২ সপ্তাহের একটি দৈবচয়িত পরীক্ষায় ৩১ জন প্রাপ্তবয়স্ক দিনে তিনবার কিশমিশ এবং ১৫ জন প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস খান। কিশমিশ গ্রুপে ৪, ৮ ও ১২ সপ্তাহে সিস্টোলিক রক্তচাপ ৬.০ থেকে ১০.২ মিমি পারদ কমে, অথচ স্ন্যাকসে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হয়নি; কোনো গ্রুপেই শরীরের ওজন বদলায়নি। টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৫১ জনকে নিয়ে ২০১৫ সালের একটি গবেষণায় প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকসের তুলনায় কালো কিশমিশে সিস্টোলিক রক্তচাপ ৮.৭ মিমি পারদ বেশি কমার কথা জানানো হয়, তবে ডায়াস্টোলিক চাপ, ওজন বা কোলেস্টেরলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ২০১৯ সালের পর্যালোচনায় তিনটি বড় কোহর্ট গবেষণার কথাও আছে, যেখানে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫৩ জন অংশগ্রহণকারীকে ২০ বছরের বেশি সময় অনুসরণ করা হয়; সপ্তাহে চার বা তার বেশি পোর্শন (প্রতি পোর্শন ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম) কিশমিশ খাওয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া যায়। পরীক্ষাগুলোতে কিশমিশকে প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, আর কোহর্ট গবেষণা কার্যকারণ নয়, সম্পর্ক দেখায়।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নিয়ে মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এগুলো ফ্রি র‍্যাডিক্যালের ক্ষতি কমিয়ে কোষকে সুরক্ষা দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌যন্ত্র ও ত্বকের জন্য ভালো। ২০১৯ সালের পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরীক্ষাগারে ও মানবদেহে করা পরীক্ষায় কিশমিশের জোরালো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সক্ষমতা আছে। একটি ক্রসওভার গবেষণায় দিনে ৫০ গ্রাম কিশমিশ খাওয়া ১৫ জন সুস্থ পুরুষের রক্তরসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সক্ষমতা দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে বেড়েছিল, যদিও চতুর্থ সপ্তাহে তা কমে যায়। তবে পর্যালোচকেরা সতর্ক ছিলেন: তাঁদের মতে, এ ধরনের গবেষণা কিশমিশ দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমায় বলে প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়, এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্লিনিক্যাল গবেষণা দরকার। পর্যালোচনার কোনো গবেষণায় ত্বক পরীক্ষা করা হয়নি, তাই কিশমিশকে ত্বকের টনিক ভাবা এখনো প্রচলিত ধারণাই।

রক্তে শর্করা ও ডায়াবেটিস


প্রতিবেদনের সবচেয়ে জোরালো সতর্কতা ছিল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য। কিশমিশে প্রাকৃতিক চিনি অনেক বেশি, তাই সকালে খালি পেটে বেশি কিশমিশ খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে; ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া কিশমিশ খাওয়া উচিত নয়। দুটি মাপকাঠি এই ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করে। হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স গ্লাইসেমিক ইনডেক্সকে (জিআই) শর্করাযুক্ত খাবারের ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত একটি ক্রম হিসেবে বর্ণনা করে, যা দেখায় খাবারটি কত দ্রুত ও কতটা রক্তে শর্করা বাড়ায়: ৫৫ বা তার কম হলে নিম্ন, ৫৬ থেকে ৬৯ মাঝারি, আর ৭০ বা তার বেশি উচ্চ। এক পোর্শনে কতটা শর্করা আসে, জিআই তা দেখায় না; তাই গবেষকেরা গ্লাইসেমিক লোডও ব্যবহার করেন, যেখানে খাবারের জিআইকে তাতে থাকা শর্করার পরিমাণ দিয়ে গুণ করা হয়; লোড ২০ বা তার বেশি উচ্চ, ১১ থেকে ১৯ মাঝারি এবং ১০ বা তার কম নিম্ন। ১০০ গ্রাম কিশমিশে ৭৯.৩ গ্রাম শর্করা থাকায় পোর্শনের আকার এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

মাপা হিসাবে কিশমিশের জিআই নিম্ন থেকে মাঝারি। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে করা এবং ২০০৮ সালে নিউট্রিশন রিসার্চ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় স্বেচ্ছাসেবীরা ৫০ গ্রাম হজমযোগ্য শর্করার সমপরিমাণ কিশমিশ খান। ১০ জন সুস্থ কম-সক্রিয় প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে জিআই ছিল ৪৯.৪, প্রিডায়াবেটিসে আক্রান্ত ১০ জনের ক্ষেত্রে ৪৯.৬ এবং ১১ জন প্রশিক্ষিত ক্রীড়াবিদের ক্ষেত্রে ৬২.৩; ইনসুলিনের প্রতিক্রিয়াও ছিল কম। ২০১৩ সালে গ্রিসের এথেন্সের হারোকোপিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় ১৫ জন সুস্থ মানুষ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ১৫ জনকে ৭৪ গ্রাম করিন্থিয়ান কিশমিশ দেওয়া হয় এবং জিআই আনুমানিক ৬৬.৩ পাওয়া যায়; গ্লুকোজ পানীয়ের তুলনায় রক্তে শর্করা ও ইনসুলিন কম বেড়েছিল। ২০১৯ সালের পর্যালোচনায় প্রকাশিত মানগুলোর পরিসর ৪৯ থেকে ৬৯ বলা হয়েছে এবং এই মাঝারি মানের জন্য কিশমিশের প্রধান চিনি ফ্রুক্টোজকে দায়ী করা হয়েছে, যার নিজের জিআই কম।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়ে ২০১৫ সালের পরীক্ষায় সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবারের আগে দিনে তিনবার ২৮ গ্রাম করে ক্যালিফোর্নিয়ার কালো কিশমিশ দেওয়া হয়; প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকসের তুলনায় খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা ২৩ শতাংশ কম পাওয়া যায়, তবে খালি পেটের গ্লুকোজ ও এইচবিএওয়ানসি কমা পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না। জিআইয়ের কারণে পর্যালোচকেরা কিশমিশকে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভালো পছন্দ বলেছেন, তবে সেগুলো ছিল ছোট ও স্বল্পমেয়াদি গবেষণা, যেখানে পরিমাণ গবেষকেরাই নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

ডায়াবেটিস ব্যাপক ও গুরুতর রোগ। ডব্লিউএইচওর ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বরের ফ্যাক্টশিট অনুযায়ী, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১৯৯০ সালের ২০ কোটি থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৮৩ কোটিতে দাঁড়ায়; সে বছর প্রাপ্তবয়স্কদের ১৪ শতাংশ এ রোগে আক্রান্ত ছিলেন। সংস্থাটি বলছে, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাভাবিক ওজন এবং তামাক বর্জন টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে বা দেরিতে আনতে পারে। এনএইচএস টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের ফল, সবজি, গোটা শস্য ও ডালসহ স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে, লবণ ও চিনিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি না খেতে এবং স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা না বলে খুব কড়া কম-ক্যালরির খাদ্যাভ্যাসে না যেতে বলে, কারণ ইনসুলিন বা অন্য ডায়াবেটিসের ওষুধ নেওয়া মানুষের জন্য তা উপযুক্ত না-ও হতে পারে। মূল প্রতিবেদনের পরামর্শও তা-ই: ডায়াবেটিস থাকলে প্রতিদিন কিশমিশ খাওয়ার অভ্যাস ও তার পরিমাণ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে ঠিক করে নিতে হবে।

ওজন, দাঁত, আইবিএস ও কিডনি


যাদের ওজন বেশি বা যারা ওজন কমাতে চান, তাদেরও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছিল প্রতিবেদনটি, কারণ কিশমিশ ক্যালরি-ঘন খাবার। ইউএসডিএর হিসাবে প্রতি ১০০ গ্রামে ২৯৯ কিলোক্যালরি এই কথার সমর্থন দেয়। এনএইচএস ব্যাখ্যা করে, বেশি চিনি খেলে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ হতে পারে, যা ওজন বাড়ায়, আর অতিরিক্ত ওজন হৃদ্‌রোগ, কয়েক ধরনের ক্যানসার ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। ২০১৯ সালের পর্যালোচনায় উদ্ধৃত একটি গবেষণায় খাবারের আগে কিশমিশ খেলে ৮ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুরা পরে কম খেয়েছে, তবে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রে কিশমিশ ও শরীরের ওজন নিয়ে আরও গবেষণা দরকার বলে পর্যালোচনায় বলা হয়েছে।

কখন খাবেন, সেটি ভাবার আরেকটি কারণ দাঁত। এনএইচএস বলছে, শুকনো ফলে চিনি বেশি থাকতে পারে এবং তা দাঁতের ক্ষতি করতে পারে; বিশেষ করে দুই বেলার খাবারের মাঝখানে শুকনো ফলের বদলে তাজা ফল খাওয়ার পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে শুকনো ফল খাবারের অংশ হিসেবে খাওয়াই ভালো, যেমন সকালের সিরিয়ালের সঙ্গে মিশিয়ে, আলাদা জলখাবার হিসেবে নয়। ২০১৯ সালের পর্যালোচনায় এমন গবেষণার কথা আছে, যেখানে শুধু কিশমিশ খেলে দাঁতের প্লাকের পিএইচ এনামেলের ক্ষতি শুরু হওয়ার সীমা ৫.৫-এর নিচে নামেনি, তবে কর্তৃপক্ষের পরামর্শ হিসেবে এনএইচএসের নির্দেশনাই প্রযোজ্য।

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) এবং দীর্ঘদিনের গ্যাস বা অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে কিশমিশ পেটের অস্বস্তি বাড়াতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। এনএইচএস বলছে, আইবিএসের জন্য সবার উপযোগী একক কোনো খাদ্যতালিকা নেই; কোন খাবারে উপসর্গ বাড়ে তা খুঁজে পেতে খাবার ও উপসর্গের ডায়েরি রাখা, দিনে তিন পোর্শনের বেশি তাজা ফল না খাওয়া এবং পেট ফাঁপা, খিঁচুনি ও বায়ু কমাতে সরবিটল নামের মিষ্টিকারকযুক্ত পণ্য এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। এনএইচএসের তথ্যে কিশমিশে সরবিটল আছে, আর ২০১৯ সালের পর্যালোচনা অনুযায়ী এতে ফ্রুক্টানও আছে; হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স জানায়, আইবিএসে আক্রান্ত মানুষ ফ্রুক্টান-জাতীয় আঁশের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারেন, যা পেট ফাঁপা বা পেটের গোলমাল ঘটাতে পারে। খাদ্যাভ্যাস বদলেও উপকার না পেলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয় এনএইচএস।

প্রতিবেদনের শেষ সতর্কতা ছিল কিডনির রোগ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (এনআইডিডিকে) ব্যাখ্যা করে, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে কিডনির পক্ষে রক্ত থেকে পটাশিয়াম বের করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে, ফলে রক্তে এর মাত্রা খুব বেড়ে যেতে পারে; আর পটাশিয়াম খুব বেশি বা খুব কম হলে হৃদ্‌যন্ত্র ও পেশির সমস্যা হতে পারে। সঠিক পরিমাণ ঠিক করতে পুষ্টিবিদের সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে সংস্থাটি মনে করিয়ে দেয়, কম পটাশিয়ামের খাবারের বড় পোর্শনে বেশি পটাশিয়ামের খাবারের ছোট পোর্শনের চেয়ে বেশি পটাশিয়াম থাকতে পারে। ওডিএস যোগ করেছে, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ থাকলে বা এসিই ইনহিবিটর ও পটাশিয়াম-সংরক্ষণকারী মূত্রবর্ধকের মতো ওষুধ নিলে পর্যাপ্ত গ্রহণমাত্রার চেয়ে কম পটাশিয়ামেও রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় পটাশিয়াম বেড়ে যেতে পারে, তাই এমন মানুষের সব উৎস মিলিয়ে কতটা পটাশিয়াম নেবেন, তা চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা উচিত।

ভেজানো কিশমিশ, খালি পেটে: গবেষণায় যা দেখা হয়েছে


প্রতিবেদনে বর্ণিত অভ্যাসের দুটি বিশেষ দিক আছে: রাতভর কিশমিশ ভিজিয়ে রাখা এবং সকালে প্রথমেই খাওয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভেজালে কিশমিশ নরম হয় এবং এর পুষ্টি শোষণ ও হজম সহজ হয়। ওপরের গবেষণাগুলোতে শুকনো কিশমিশই ব্যবহার করা হয়েছে, রোদে শুকানো, ক্যালিফোর্নিয়ার কালো বা করিন্থিয়ান, মেপে দেওয়া পরিমাণে; আর ডায়াবেটিসের পরীক্ষায় তা খাওয়া হয়েছে দিনে তিনবার খাবারের আগে। এই লেখার জন্য দেখা কোনো কর্তৃপক্ষ বা গবেষণায় ভেজানো ও শুকনো কিশমিশের তুলনা, কিংবা সকাল ও দিনের অন্য সময়ের তুলনা করা হয়নি; ফলে প্রমাণগুলো খাবার হিসেবে কিশমিশ নিয়ে, ভিজিয়ে খাওয়ার রীতি নিয়ে নয়।

যে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক এই অভ্যাস রাখতে চান, এনএইচএসের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর জন্য কিশমিশ আলাদা জলখাবার হিসেবে নয়, সকালের নাশতার মতো কোনো খাবারের সঙ্গে খাওয়াই ভালো, আর পরিমাণ প্রায় ৩০ গ্রাম। ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, রক্তস্বল্পতা বা আইবিএস থাকলে কতটা কিশমিশ, কখন খাবেন, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শে।

ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ২৪, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, এনএইচএস, এনআইএইচ অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টস, মেডলাইনপ্লাস, এনআইডিডিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ (দ্য নিউট্রিশন সোর্স), নিউট্রিয়েন্টস (২০১৯), নিউট্রিশন রিসার্চ (২০০৮), প্ল্যান্ট ফুডস ফর হিউম্যান নিউট্রিশন (২০১৩), পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন (২০১৪), দ্য ফিজিশিয়ান অ্যান্ড স্পোর্টসমেডিসিন (২০১৫), জার্নাল অব মেডিসিনাল ফুড (২০০৩, ২০১১), ব্রিটিশ জার্নাল অব নিউট্রিশন (২০০৩), উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি তাজা আপেলের একটি যায় বিদেশে, রপ্তানি আয় রেকর্ড

২০২৫/২৬ বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭ কোটি পাউন্ড তাজা আপেল রপ্তানি করেছে, যা মোট তাজা উৎপাদনের প্রায় ২৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় রেকর্ড ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে; বড় ক্রেতা মেক্সিকো ও কানাডা।

ers_usda১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

রাজবাড়ীর বাজিতপুরে দুই একরে চার হাজার ড্রাগন গাছ, দিনে উঠছে ৫০ মণ ফল

রাজবাড়ী সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুরে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগানে গাছপ্রতি ১০-১২ কেজি ফল ধরেছে; ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ফল উঠছে, পাইকারি দর কেজি ১৫০ টাকা।

ঢাকা মেইল১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

আপেলগাছের গোড়ায় লালচে গুঁড়া? সতর্ক করছে বিরল কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা

কানাডার ম্যানিটোবার কৃষি বিভাগ ফলচাষিদের রাউন্ডহেডেড অ্যাপল ট্রি বোরার নিয়ে সতর্ক থাকতে বলছে। এই লম্বা-শুঙ্গ গুবরে পোকার কীড়া জীবন্ত আপেল ও সাস্কাটুন গাছের ভেতরে তিন বছর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কাটে; কাণ্ডের গোড়ায় লালচে গুঁড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)