কার্তিক মাসে বাংলাদেশের মাঠ এক ঋতু থেকে আরেক ঋতুর হাতে যায়। আমন ধান সোনালি হয়ে কাটার অপেক্ষায়, আর পাশের জমিতে মাটির রস থাকতে থাকতেই গম, সরিষা ও আলুর জন্য চাষ দিতে হয়। এখন এক সপ্তাহ পিছিয়ে পড়লে শীতের ফসলের একটা অংশ পরে হাতছাড়া হতে পারে।
বাংলাদেশের বর্ষপঞ্জিতে কার্তিক মাস ১৭ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত, আর কার্তিকের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় হেমন্তকাল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) তাদের মাসিক পত্রিকা ‘কৃষিকথা’য় কার্তিক মাসের করণীয়র তালিকা প্রকাশ করে; লিখেছেন পত্রিকাটির সম্পাদক কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম। মূল কথা সহজ: রোদেলা দিনে আমন কাটুন, ভালো বীজ রাখুন, আর সময়মতো রবি (শীতকালীন) ফসল শুরু করুন।
এই প্রতিবেদনে সেই তালিকা ফসল ধরে ধরে সাজানো হয়েছে: আমন কাটা ও বীজ সংরক্ষণ, গম, আখ, ভুট্টা, সরিষা ও অন্যান্য তেলফসল, আলু ও মিষ্টিআলু, ডাল, শীতের শাকসবজি, তুলা, কলা ও ফলগাছ। বীজ ও সারের মাত্রা এআইএস যেভাবে ছেপেছে ঠিক সেভাবেই দেওয়া হলো; সঙ্গে আছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য, যা দেখায় প্রতিটি ফসল কেন গুরুত্বপূর্ণ।
কার্তিক: আমন কাটা আর রবি মৌসুমের সেতু
কার্তিক আর অগ্রহায়ণ মিলে হেমন্তকাল। ডেইলি স্টার বাংলা ২০২৪ সালের অক্টোবরে কার্তিকের প্রথম দিনে লিখেছিল, এ সময় উষ্ণতা কমতে থাকে, আর পরের কয়েক সপ্তাহে নতুন ধানে কৃষকের গোলা ভরে ওঠে, যার উৎসব নবান্ন।
একই প্রতিবেদনে কঠিন এক ইতিহাসও মনে করিয়ে দেওয়া হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলে এই মাসকে একসময় বলা হতো ‘মরা কার্তিক’, কারণ কার্তিক মাসেই শুরু হতো মঙ্গা, যখন ঘরের চাল ফুরিয়ে যেত অথচ আমন তখনো কাটা হয়নি।
শীতের ফসলের পঞ্জিকার অনেকটাই নির্ভর করে এই কয়েক সপ্তাহের ওপর। বাংলাপিডিয়া জানায়, গম রবি মৌসুমের ফসল; শুকনো আবহাওয়া ও উজ্জ্বল রোদ লাগে, আর জাত ও আবহাওয়াভেদে বপন থেকে কাটা পর্যন্ত লাগে ১০০ থেকে ১২০ দিন। সরিষা, আলু, ডাল ও শীতের সবজিও বর্ষার পর মাটিতে ঠিকঠাক রস থাকতে থাকতেই বুনতে বা লাগাতে হয়।
এআইএস ২০২৫ সালের লেখাটি শুরু করেছে এই কথা দিয়ে যে কার্তিকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকেরা মাঠে ব্যস্ত থাকেন; ধান থেকে ফলগাছ পর্যন্ত পুরো খামারের কাজ মিলিয়ে মাসের পরিকল্পনা করতে বলেছে তারা।
আমন ধান কাটা ও আগামী মৌসুমের বীজ রাখা
এআইএস বলেছে, কার্তিক মাসে অনেকের আমন ধান পেকে যাবে, তাই রোদেলা দিন দেখে ধান কাটতে হবে। আগামী মৌসুমের জন্য বীজ রাখতে চাইলে কাটার আগেই সুস্থ, সবল ও ভালো ফলনের অংশটি বেছে নিতে হবে।
কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াইয়ের পর ধান রোদে ভালোমতো শুকাতে হবে। এসব কাজে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করা যেতে পারে বলে এআইএস উল্লেখ করেছে। বীজ সংরক্ষণে তাদের ধাপগুলো:
- রোদে শুকানো গরম ধান ঝেড়ে পরিষ্কার করে ছায়ায় রেখে ঠান্ডা করুন।
- এরপর বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন।
- বীজের পাত্র সরাসরি মাটি বা মেঝের ওপর না রেখে পাটাতনের ওপর রাখুন।
- পোকার উপদ্রব এড়াতে নিম, নিসিন্দা বা ল্যান্টানার পাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে ধানের সঙ্গে মিশিয়ে দিন।
২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের কার্তিক মাসের তিনটি লেখাতেই এই ধাপগুলো একই ছিল; অর্থাৎ পরামর্শটি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত।
গম: জাত, বীজের হার, সার ও সেচ
এআইএস জানায়, কার্তিক মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে গম বপনের প্রস্তুতি নিতে হয়, আর দো-আঁশ মাটিতে গম ভালো হয়। বাংলাপিডিয়া যোগ করেছে, বাংলায় গমের প্রচলন ১৯৩০-৩১ সালে, এবং এঁটেল দো-আঁশ মাটিতেও গম ভালো জন্মায়।
বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে আধুনিক গমের গবেষণা শুরু হয় ১৯৬৫ সালে, যখন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দুটি মেক্সিকান জাত, পেনজামো ৬২ ও সোনোরা ৬৪-এর বীজ আসে; আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের গম কর্মসূচির তৎকালীন পরিচালক নরম্যান ই. বোরলগ ১৯৬৫ ও ১৯৬৮ সালে ঢাকা সফর করেন। স্বাধীনতার পর শীতকালের বিকল্প খাদ্যফসল হিসেবে গমকে বেছে নেওয়া হয়, আর ১৯৭৫ সালে সরকার ৪,০০০ টন বীজ আমদানি করে।
বছরের পর বছর জাত বদলেছে। এই প্রতিবেদনের মূল সংস্করণে পুরোনো তালিকার আনন্দ, বরকত, কাঞ্চন, সৌরভ, গৌরব, শতাব্দী, সুফী, বিজয়, বারি গম-২৭ ও বারি গম-২৮ ছিল। ২০২৫ সালের কার্তিকের জন্য এআইএস পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন জাতের সুপারিশ করেছে:
- তাপসহিষ্ণু: বারি গম-৩০, বারি গম-৩২ ও বিডব্লিউএমআরআই গম-৪।
- যেসব এলাকায় শীত তাড়াতাড়ি চলে যায়: বারি গম-৩২, বিডব্লিউএমআরআই গম-১ ও বিডব্লিউএমআরআই গম-৪।
- যেসব এলাকায় শীত বেশি দিন থাকে: বারি গম-৩০, বারি গম-৩২ এবং বিডব্লিউএমআরআই গম-১ থেকে বিডব্লিউএমআরআই গম-৫।
- লবণাক্ত জমিতে: লবণাক্ততাসহিষ্ণু বিনা গম-১।
বিডব্লিউএমআরআই হলো বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিনা বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, আর বারি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট।
এআইএসের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের লেখায় এবং মূল প্রতিবেদনে যে মাত্রা ও নিয়ম অপরিবর্তিত ছিল, তা হলো:
- বপনের আগে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করে নিন।
- বীজের হার: সেচযুক্ত চাষে বিঘাপ্রতি ১৬ কেজি, সেচবিহীন চাষে বিঘাপ্রতি ১৩ কেজি।
- ইউরিয়া ছাড়া অন্য সব সার জমি তৈরির শেষ চাষে দিন; ইউরিয়া তিন কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করুন।
- বপনের ১৩-২১ দিনের মধ্যে প্রথম সেচ, এরপর ৩০-৩৫ দিন পরপর আরও ২ বার সেচ দিলে খুব ভালো ফলন হয়।
- বেড প্লান্টার যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে; এআইএসের হিসাবে এতে সেচের খরচ ও সময় ২৫ শতাংশ কমে।
ফসলটির এই সহায়তা দরকার ছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট জানায়, বিবিএসের হিসাবে ২০২৪-২৫ মৌসুমে কৃষকেরা ২.৮ লাখ হেক্টর জমিতে ১০.৪১ লাখ টন গম ঘরে তুলেছেন; উৎপাদন পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম, আর আবাদি জমি ইতিহাসে সবচেয়ে কম। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে গম হয়েছিল ৮.৮ লাখ হেক্টরে, যা সর্বোচ্চ। দেশে বছরে মোটামুটি ৭৫ লাখ টন গম লাগে, যার বেশিরভাগই আমদানি করতে হয়।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষিবিদেরা এর কারণ হিসেবে বলেন, ভুট্টা, আলু ও দামি সবজির তুলনায় গমে লাভ কম, উন্নত জাতের ঘাটতি, ২০১৬ সালের গমের ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শীতকাল ছোট হয়ে আসা। বিডব্লিউএমআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ রেজাউল কবির জানান, ব্লাস্ট প্রতিরোধী বারি গম-৩৩ তখন গমের মোট জমির এক-তৃতীয়াংশের বেশি জায়গায় চাষ হচ্ছিল; হেক্টরপ্রতি ফলন ১৯৯০-এর দশকের শেষের ২.১৬ টন থেকে বেড়ে ৩.৮ টন হয়েছে। বিডব্লিউএমআরআইয়ের এক সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিডব্লিউএমআরআই গম-৪-কে লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত বলে উল্লেখ করেন, যার ফলন সম্ভাবনা হেক্টরপ্রতি ৫.৫ টন; দক্ষিণাঞ্চলে আমনের পর পতিত থাকা জমির কথাও বলেন তিনি।

আখ ও ভুট্টা
এআইএস বলেছে, ভালোভাবে তৈরি জমিতে আখের চারা রোপণের উপযুক্ত সময় এখন। সাম্প্রতিক সব লেখায় এবং মূল প্রতিবেদনে দূরত্ব ও চারার সংখ্যা একই ছিল:
- সারি থেকে সারির দূরত্ব: ৯০ সেমি থেকে ১২০ সেমি।
- চারা থেকে চারার দূরত্ব: ৬০ সেমি।
- এভাবে রোপণ করলে বিঘাপ্রতি ২২০০-২৫০০টি চারা লাগে।
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় আখ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। কিছুটা বালি ও পলি এবং প্রচুর জৈব পদার্থযুক্ত এঁটেল দো-আঁশ মাটিতে, মাটির পিএইচ ৬ থেকে ৭.৫ হলে আখ সবচেয়ে ভালো হয়; বাংলাদেশে আখ কাটার মৌসুম অক্টোবর থেকে মার্চ। গাছের আগার অংশ বা ‘সেট’ লাগিয়ে আখ চাষ হয়, আর কাটার পর জমিতে থাকা গোড়া থেকে মুড়ি আখও করা যায়। ঈশ্বরদীর আখ গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০টি জাত অবমুক্ত করেছে বলে বিশ্বকোষটি জানায়; প্রধান চাষ এলাকার মধ্যে আছে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর।
ভুট্টার জন্য এখনই জমি তৈরি করে উন্নত জাতের বীজ বপনের পরামর্শ দিয়েছে এআইএস। তাদের ২০২৪ সালের তালিকায় ছিল খই ভুট্টা, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭, বারি মিষ্টি ভুট্টা-১, বারি বেবি কর্ন-১ এবং বিডব্লিউএমআরআই হাইব্রিড ভুট্টা-১ ও ২। খরাপ্রবণ এলাকা ও সাদা দানার জন্য বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২ ও ১৩, আর ঝড়-বাতাসে হেলে ও ভেঙে পড়া প্রতিরোধী জাত হিসেবে বিডব্লিউএমআরআই হাইব্রিড ভুট্টা-১ ও বিডব্লিউএমআরআই বেবি কর্ন-১-এর কথা বলা হয়। মূল প্রতিবেদনের তালিকা (বারি ভুট্টা-৬ ও ৭ এবং বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭ থেকে ১১) ছিল পুরোনো।
শীতের জমিতে ভুট্টা এখন গমের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। কৃষিবিজ্ঞানীরা ২০২৫ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কৃষকেরা হেক্টরপ্রতি ১১-১২ টন ভুট্টা পান, যা গমের প্রায় তিন গুণ, আর হাঁস-মুরগি, মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্যের চাহিদার কারণে দামও ভালো থাকে।

সরিষা ও অন্যান্য তেলফসল
কার্তিক সরিষা বোনারও উপযুক্ত সময়। ২০২৫ সালের জন্য এআইএস স্বল্পমেয়াদি বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-১৭ ও বারি সরিষা-২০ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতগুলোর সুপারিশ করেছে। ২০২৪ সালের লেখায় স্বল্পমেয়াদি জাতের মধ্যে বিনা সরিষা-৪, ৯, ১০, ১১ ও ১২, আর দীর্ঘমেয়াদির মধ্যে বারি সরিষা-১১, ১৬, ১৮ ও ১৯-এর নাম ছিল। মূল প্রতিবেদনের তালিকা (টরি-৭, রাই-৫, কল্যাণীয়া, সোনালি, সম্পদ, বারি সরিষা-৬, ৭ ও ৮) এসেছিল আগের একটি লেখা থেকে।
এআইএসের ২০২৫ সালের হিসাবে বিঘাপ্রতি বীজ ও সার:
- বীজ: গড়ে ১ থেকে ১.৫ কেজি, জাতভেদে সামান্য কমবেশি।
- ইউরিয়া: ৩৩-৩৭ কেজি।
- টিএসপি: ২২-২৪ কেজি।
- এমওপি: ১১-১৩ কেজি।
- জিপসাম: ২০-২৪ কেজি।
- বোরন: ৪০০ গ্রাম।
- দস্তা সার: ১ কেজি।
সরিষা ছাড়াও তিল, তিসি, চীনাবাদাম ও সূর্যমুখী এ সময় চাষ করা যায় বলে জানিয়েছে এআইএস।
দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে সরিষা। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২২ সালের মে মাসে জানায়, দেশে বছরে ২.৪-২.৫ মিলিয়ন টন ভোজ্যতেলের চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন মাত্র ০.৩ মিলিয়ন টন; কৃষি মন্ত্রণালয়ের তিন বছরের কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে চাহিদার ৪০ শতাংশ দেশি তেলফসল থেকে মেটানো, মূলত আমন ও বোরোর মাঝে পতিত থাকা ২.০ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে স্বল্পমেয়াদি জাত বুনে। ২০২৩ সালের মে মাসে ইউএনবি কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানায়, সেই মৌসুমে ৮,১২,০০০ হেক্টরে সরিষা হয়েছে, আগের বছর যা ছিল ৬,১০,০০০ হেক্টর; উৎপাদন ৮,২৪,০০০ টন থেকে বেড়ে ১১,৫২,০০০ টন হয়েছে, এক বছরে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি।
বাংলাপিডিয়া লিখেছে, একসময় সরিষার তেলই ছিল দেশের একমাত্র রান্নার তেল, যা গরুটানা ঘানিতে ভাঙানো হতো; টাঙ্গাইল, যশোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার মতো জেলায় সরিষার জমি তুলনামূলক বেশি।

আলু ও মিষ্টিআলু
এআইএস জানায়, আলুর জন্য জমি তৈরি ও বীজ বপনের উপযুক্ত সময় এই মাস। হালকা মাটি অর্থাৎ বেলে দো-আঁশ মাটি আলুর জন্য বেশ উপযোগী। ২০২৫ সালের লেখায় বারির উদ্ভাবিত আগাম ও উচ্চফলনশীল জাত, এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ও খাবারের উপযোগী জাত বেছে নিতে বলা হয়েছে।
২০২৩ ও ২০২৪ সালের লেখায় একরপ্রতি মাত্রা ছিল:
- বীজ আলু: ৬০০ কেজি।
- ইউরিয়া ১৩০ কেজি, টিএসপি ৯০ কেজি, এমওপি ১০০ কেজি, জিপসাম ৬০ কেজি ও দস্তা সার ৬ কেজি; জমির অবস্থাভেদে এ পরিমাণ কমবেশি হতে পারে বলে এআইএস উল্লেখ করেছে।
- জৈবসার: ৪-৫ টন; এআইএসের মতে এতে ফলন অনেক বেশি হয়।
আগাছা পরিষ্কার, সেচ, সারের উপরিপ্রয়োগ, মাটি আলগা করা বা কেলিতে মাটি তুলে দেওয়া, বালাই দমন ও মালচিং আলু চাষের আবশ্যিক কাজ; আর বন্যার পানি নেমে গেলে বিনা চাষে মালচিং দিয়ে আলু আবাদ করা যায়, বলেছে এআইএস। বাংলাপিডিয়া যোগ করেছে, সারি থেকে সারির দূরত্ব সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ সেমি; নভেম্বরের প্রথম পক্ষ রোপণের প্রচলিত সময়, তবে উত্তর-পশ্চিমের কিছু এলাকায় আগাম ফসলের জন্য কৃষকেরা অক্টোবরেই লাগান; বেশিরভাগ জাত তোলা হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চে।
আগের আলু মৌসুমটি ছিল বড়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি ডিএইর বরাতে জানায়, মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য ছিল ৪.৬৭ লাখ হেক্টর, কিন্তু কৃষকেরা আলু লাগিয়েছেন ৫.২১ লাখ হেক্টরে; বিবিএসের হিসাবে ২০২৪ সালে আলু হয়েছিল ৪.৫৭ লাখ হেক্টরে। ২০২৪ সালের চড়া দাম, যা সে বছরের নভেম্বরে কেজিপ্রতি ৮০ টাকায় উঠে পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ হয়েছিল, কৃষকদের বেশি আলু লাগাতে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেশের হিমাগারের ধারণক্ষমতা ৪৫ লাখ টন বলে জানান।
নদীর ধারের পলিমাটি ও বেলে দো-আঁশ মাটিতে মিষ্টিআলু ভালো ফলন দেয়, বলেছে এআইএস। ২০২৪ সালের লেখায় আধুনিক জাত হিসেবে কমলাসুন্দরী, বারি মিষ্টিআলু-১২, ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭-এর নাম আছে; মূল প্রতিবেদনের তালিকা (তৃপ্তি, কমলাসুন্দরী, দৌলতপুরী) ছিল পুরোনো। লতা ও সারের হিসাব এআইএসের বিভিন্ন বছরের লেখায় আলাদা, তাই নিজের জমির জন্য মাত্রা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নিন।

ডাল ফসল ও শীতের শাকসবজি
মসুর, মুগ, মাষকলাই, খেসারি, ফেলন, অড়হর, সয়াবিন, ছোলাসহ অন্যান্য ডাল এ সময় চাষ করা যায়, জানিয়েছে এআইএস। এর জন্য উপযুক্ত জাত, সময়মতো বপন, সুষম সার, পরিচর্যা, সেচ ও বালাই ব্যবস্থাপনা জরুরি। মূল প্রতিবেদনে ডালকে ‘গরিবের আমিষ’ বলে আমিষের ঘাটতি পূরণে ডাল চাষে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছিল।
শীতকালীন শাকসবজি চাষের উপযুক্ত সময় এখন। এআইএসের পরামর্শ:
- যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বীজতলায় উন্নত জাতের দেশি-বিদেশি ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, বাটিশাক, টমেটো ও বেগুনের চারা তৈরির জন্য বীজ বুনুন।
- গত মাসে চারা তৈরি করে থাকলে এখন মূল জমিতে রোপণ করুন।
- মাটিতে জো আসার সঙ্গে সঙ্গে শীতের সবজি রোপণ করুন।
- এ মাসে হঠাৎ বৃষ্টিতে সদ্য রোপণ করা চারা নষ্ট হতে পারে, তাই পানি নিষ্কাশনের নালা রাখুন।
- রোপণের পর আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ, সেচ ও নিকাশের কাজ করুন।
- লালশাক, মুলাশাক, গাজর ও মটরশুঁটির বীজও এ সময় বোনা যায়।
তুলা, কলা ও ফলগাছের যত্ন
এআইএস বলেছে, এ সময় শেষবারের মতো তুলাখেতের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। ২০২৫ সালের লেখায় তিন কিস্তির শেষ কিস্তির ইউরিয়া বিঘাপ্রতি ৭-৭.৫ কেজি গাছ থেকে ৫-৬ সেমি দূরে পার্শ্ব প্রয়োগ এবং বাতাসে গাছ যাতে হেলে না পড়ে সেজন্য গোড়ায় মাটি তুলে দিতে বলা হয়েছে। পোকা দমনে আইপিএম বা শুধু ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমে, আর বীজ ফসলের রগিং এ মাসেই শেষ করতে হবে।
এ মৌসুমে কলার চারা রোপণ করা যায়। এআইএসের মতে প্রথম রোপণের সময় আশ্বিন-কার্তিক (মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য নভেম্বর), আর বারি কলা-১, ২, ৩, ৪ ও ৫ দেশের সব জায়গায় চাষের উপযোগী। চারা নিয়ে তাদের পরামর্শ:
- রোপণের জন্য অসি তেউড় উত্তম।
- সুস্থ, রোগমুক্ত বাগান থেকে তেউড় সংগ্রহ করুন; তিন মাস বয়সী তেউড় ভালো।
- খাটো জাতের জন্য ৩৫-৪৫ সেমি আর লম্বা জাতের জন্য ৫০-৬০ সেমি লম্বা তেউড় ব্যবহার করুন।
এআইএসের ২০২৪ সালের লেখায় কলাগাছপ্রতি সার ছিল জৈবসার ১৫-২০ কেজি, টিএসপি ৪০০ গ্রাম, এমওপি ৬০০ গ্রাম, ইউরিয়া ৫০০-৬৫০ গ্রাম ও জিপসাম ২০০-৩০০ গ্রাম, যা জমি তৈরি, গর্ত ও পরের উপরিপ্রয়োগে ভাগ করে দিতে হয়। টিস্যু কালচারে উৎপাদিত জি-৯ জাতের কলা চাষ জনপ্রিয় হয়েছে বলেও সেখানে উল্লেখ ছিল।
অন্যান্য ফলগাছে সাধারণত কিস্তিতে সার দিতে হয়: বর্ষার আগে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে একবার, পরের কিস্তি বর্ষার শেষে আশ্বিন-কার্তিকে, বলেছে এআইএস। ফল সংগ্রহের পর বয়স্ক গাছের অঙ্গ ছাঁটাইয়ের ভালো সময় এখন, কারণ এতে নতুন ডালপালা গজায় এবং প্রচুর ফল ধরে। শুকনো মৌসুমে চারা ও বয়স্ক গাছে সেচের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অবমুক্ত জাতের বীজ, স্থানীয় মাটির উপযোগী সারের মাত্রা বা কোনো পোকামাকড়ের বিষয়ে পরামর্শের জন্য কৃষকেরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন; যেকোনো কীটনাশক ছিটানোর আগে মোড়কের নির্দেশনা পড়ুন এবং স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন।
ছবি: Shameem Reza / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য অ্যাগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত কার্তিক মাসের কৃষি), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইউএনবি, বাংলাপিডিয়া




মন্তব্য
(০)