মাঠ থেকে তোলার পর সংরক্ষণ ও পরিবহনের অভাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফল ও সবজি নষ্ট হয়। এই ক্ষতি কমাতে ছোট, সাশ্রয়ী ও কৃষক-উপযোগী কোল্ড স্টোরেজ গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন কৃষি যান্ত্রিকীকরণ গবেষক ও পরামর্শক ড. সুরজিৎ সরকার। ২০২৬ সালের ২৭ জুন জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি লেখেন, ফসল নষ্ট হলে শুধু একজন কৃষকের নয়, তার পরিবার, সমাজ ও পুরো দেশের ক্ষতি হয়।
ফসল তোলার পর কত ক্ষতি
ড. সুরজিৎ সরকারের হিসাবে দেশে ফল ও সবজির ফসল-পরবর্তী ক্ষতি ২০ থেকে ৪০ শতাংশ। এই ধারণার পেছনে আগের গবেষণাও আছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে করা এক গবেষণার ফল নিয়ে ২০১১ সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ১৩টি ফল ও সবজিতে ক্ষতি ২৩.৬ থেকে ৪৩.৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি কাঁঠালে, এরপর আনারসে (৪৩ শতাংশ) ও পেঁপেতে (৩৯.৯ শতাংশ)। খুচরা দামে এই ক্ষতির মূল্য বছরে প্রায় ৩,৪৪২ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল।
কেন এত ক্ষতি, নিবন্ধে তার কয়েকটি কারণ দেখানো হয়। ফল ও সবজিতে পানির ভাগ বেশি বলে এগুলো দ্রুত পচে। ঠিক সময়ে ও ঠিকভাবে না তোলা, অপরিষ্কার পাত্রে রাখা এবং রোদ-বৃষ্টিতে খোলা অবস্থায় পরিবহনে ক্ষতি বাড়ে। মৌসুমে একসঙ্গে বেশি পণ্য বাজারে এলে দাম পড়ে যায়, আর সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। বাকৃবির গবেষণাতেও দুর্বল পরিবহন ও উপযুক্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবকে বড় কারণ বলা হয়েছিল।

কোল্ড স্টোরেজ আছে, তবে মূলত আলুর জন্য
দেশের কোল্ড স্টোরেজগুলো প্রধানত আলু রাখার জন্য তৈরি। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের ৪০০টি হিমাগারে প্রায় ৬০ লাখ টন আলু রাখা যায় বলে ২০২১ সালে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়। ড. সরকারের মতে, এসব হিমাগার আকারে বড়, ব্যয়বহুল এবং শহর বা আলু উৎপাদনের এলাকায় কেন্দ্রীভূত, তাই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের নাগালের বাইরে।
নিবন্ধে বাকৃবির কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের গবেষণার উদাহরণ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী চুন ও গরম পানিতে প্রাক-শোধনের পর আম্রপালি, হাড়িভাঙ্গা, ল্যাংড়া ও বারি-৪ জাতের আম ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশ আর্দ্রতায় ১৪ থেকে ২১ দিন ভালো থাকে। গাজর, বাঁধাকপি, মুলা ও ফুলকপি ৫ ডিগ্রিতে ১৪ থেকে ৩৮ দিন, টমেটো ও কাঁচা মরিচ ৮ ডিগ্রিতে ২১ থেকে ৩০ দিন এবং আনারস, লেবু ও আমড়া ১০ ডিগ্রিতে ৭ থেকে ২৬ দিন রাখা যায়।

ছোট হিমাগারের নকশা ও সরকারের পরিকল্পনা
ড. সরকারের বর্ণনায় নতুন ছোট কোল্ড স্টোরেজ ২২০ ভোল্টের সাধারণ গৃহস্থালি বিদ্যুতে চলে। এতে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপে সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহারের ব্যবস্থা আছে। তার প্রস্তাব, গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তারা এমন ইউনিট কিনে ফি নিয়ে কৃষকের ফসল রাখতে পারেন। পাশাপাশি মাঠেই প্রি-কুলিং, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ও সংরক্ষণ মিলিয়ে পূর্ণ কোল্ড চেইন দরকার, আর অর্থায়নে সরকারি ভর্তুকি, বিশেষ কৃষিঋণ, কৃষক সমবায়, এনজিও এবং বিশ্বব্যাংক, ইফাদ ও এডিবির মতো উন্নয়ন সহযোগীরা ভূমিকা রাখতে পারে।
নিবন্ধটি প্রকাশের দুই সপ্তাহ আগে, ২০২৬ সালের ১৫ জুন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, আগামী এক থেকে দুই বছরে সারা দেশে ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ১৫ থেকে ২০ জন কৃষক মিলে সমবায়ের ভিত্তিতে চালাবেন (ঢাকা টাইমস)। ১৮ জুন ডেইলি অবজারভারে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সাবেক মহাপরিচালক ড. এম শহিদুল ইসলাম লেখেন, প্রযুক্তিটি ২০২৫ সালে একটি প্রকল্পে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছিল, কিছু ইউনিটে প্রায় ১০ টন রাখা যায় এবং সৌরশক্তি এর খরচ কমাতে পারে। ড. সরকার এই পরিকল্পনাকে আশার কথা বলে উল্লেখ করেন।

বিশ্বজুড়ে এই সমস্যার মাত্রাও বড়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১১ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষের খাওয়ার জন্য উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টন, নষ্ট বা অপচয় হয়।
ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (ড. সুরজিৎ সরকারের মতামত নিবন্ধ), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ঢাকা টাইমস, দ্য ডেইলি অবজারভার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)





মন্তব্য
(০)