প্রতি বর্ষায় দেশের কোনো না কোনো এলাকার কৃষক একই দৃশ্য দেখেন: টানা বৃষ্টি, জমিতে জমে থাকা পানি, আর রোপণের জন্য তৈরি আমনের বীজতলা পানির নিচে পচে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে ভারী বৃষ্টি ও বঙ্গোপসাগরের মৌসুমি নিম্নচাপে আকস্মিক বন্যা অন্তত ১২টি জেলায় আঘাত হানে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানায়, ১৯ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমির আমন বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে; ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এ খবর দেয়।
এমন অবস্থার একটি সমাধান হিসেবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ২০০৩ সাল থেকে ড্রাম সিডারের কথা বলে আসছে। প্লাস্টিকের হালকা এই যন্ত্র কাদা করা জমিতে অঙ্কুরিত ধানবীজ সোজা সারিতে বুনে দেয়; ফলে বীজতলা, চারা তোলা বা রোপণের দরকার হয় না। এই প্রতিবেদনে জানা যাবে যন্ত্রটি কী, আমন মৌসুমের পরীক্ষায় ব্রি ও আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) কী পেয়েছে, বর্ষায় কোন জমিতে এটি চলে, কীভাবে বুনতে ও আগাছা দমন করতে হয়, আর বীজতলা নষ্ট হলে ব্রি আর কোন কোন বিকল্পের কথা বলে।
বৃষ্টি ও বন্যায় আমনের বীজতলা নষ্ট হলে
আমন বাংলাদেশের প্রধান বর্ষাকালীন ধান। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, দেশের ধানের মধ্যে রোপা আমনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; ২০০৯-১০ সালে মোট ধানি জমির প্রায় ৪৬ শতাংশে রোপা আমনের চাষ হয়েছিল এবং এটি সারা দেশেই হয়। বোনা আমনের চাষ হয় মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। রোপা আমন কাটা হয় নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে।
ফসলটি বর্ষায় হয় বলে এর সবচেয়ে দুর্বল সময় শুরুর দিকটা। ধান চাষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্রির একটি ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, বন্যাকবলিত অঞ্চলে আমন মৌসুমে সাধারণত ধানের প্রাথমিক অবস্থায়, অর্থাৎ বীজতলায় এবং রোপণের পর কুশি গজানোর সময় বন্যায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন নতুন করে চারা উৎপাদন ও রোপণ করতে হয়; এতে কৃষকের খরচ বাড়ে, রোপণ পিছিয়ে যায় এবং ফলন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হয়।
২০২৪ সালের মৌসুমে সমস্যার মাত্রা স্পষ্ট হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, বন্যায় আমন ও আউশ ধানের ২ লাখ ৯১ হাজার ৩৩ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং চালের উৎপাদন সাড়ে ৮ লাখ টন কমতে পারে। ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানায়, পূর্বাঞ্চলের ২৩ জেলায় কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ ৩৩.৪৬ বিলিয়ন টাকা; এর মধ্যে ১৪ হাজার ৯০৮ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা, আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ১.৪ মিলিয়নের বেশি।
ক্ষতি শুধু পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে ডিএইর তথ্যে বলা হয়, ২২ থেকে ২৬ আগস্টের বৃষ্টি ও বন্যায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে ২ হাজার ৮৪৫ জন কৃষকের ১৩৬ হেক্টর আমন বীজতলা নষ্ট হয়; ক্ষতির পরিমাণ ৬৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
ড্রাম সিডার কী এবং কীভাবে কাজ করে
ব্রির ভাষায়, ড্রাম সিডার প্লাস্টিকের তৈরি একটি আধুনিক বপন যন্ত্র, যা দিয়ে কাদা মাটিতে অঙ্কুরিত বীজ সারি করে সরাসরি বোনা যায়। ২০০৫ সালে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক লেখায় ব্রির তৎকালীন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোশাররফ হোসেন যন্ত্রটির বর্ণনা দেন এভাবে: উচ্চ ঘনত্বের প্লাস্টিকের তৈরি সাধারণ একটি যন্ত্র, যাতে ছয় থেকে আটটি ড্রাম থাকে; প্রতিটি ড্রামের ব্যাস প্রায় ১৬ সেন্টিমিটার, আর প্রতিটির দুই পাশে ৮-৯ মিলিমিটার মাপের এক জোড়া সারিতে ছিদ্র থাকে।
ড্রামগুলো একটি কেন্দ্রীয় দণ্ডে বসানো থাকে, দুই প্রান্তে থাকে প্লাস্টিকের বড় দুটি চাকা, আর টানার জন্য একটি হাতল। ইরির রাইস টুডে সাময়িকী ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাখ্যা করে, একজন মানুষ স্বাভাবিক হাঁটার গতিতে যন্ত্রটি জমির ওপর দিয়ে টেনে নিলে ছিদ্র দিয়ে অঙ্কুরিত বীজ পরিপাটি সারিতে পড়ে। ব্রি জানায়, ছয়টি ড্রামে বীজ ভরে যন্ত্রটি দিয়ে একসঙ্গে ১২ লাইনে বীজ বোনা যায়।
যন্ত্রটি হালকা। ড. মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, খালি অবস্থায় এর ওজন মাত্র ৬ কেজির মতো, আর অঙ্কুরিত বীজ ভরলে ১৮-২০ কেজি; তাই গড় স্বাস্থ্যের একজন কৃষক কোমর না বাঁকিয়েই এটি টানতে পারেন।
রাইস টুডের তথ্যে, যন্ত্রটির মূল নকশা ইরির; পরে ভিয়েতনামের গবেষক ও নির্মাতারা একে আরও হালকা, সস্তা ও সহজে ব্যবহারযোগ্য করেন। ২০০৫ সালে এর দাম ছিল প্রায় ৪০ মার্কিন ডলার, টিকত ছয় থেকে আট বছর। ড. মোশাররফ হোসেনের তথ্যে, প্লাস্টিকের ড্রাম সিডার প্রথম ব্যবহার হয় ভিয়েতনামে, ২০০০ সালে। ইরির রাইস নলেজ ব্যাংক যোগ করে, ড্রাম সিডার সবচেয়ে ভালো কাজ করে ভালোভাবে সমান করা, মসৃণ ও ভেজা জমিতে; মাটি আঠালো হলে বা যন্ত্রের নকশা দুর্বল হলে ছিদ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে ড্রাম সিডারের যাত্রা
ব্রি ২০০৩ সালে বাংলাদেশে ড্রাম সিডার প্রবর্তন করে, আর প্রথম পরীক্ষা হয় আমন মৌসুমে। রাইস টুডের তথ্যে, এটি ছিল ইরি ও ব্রির যৌথ উদ্যোগ, অর্থায়ন করে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ)। পরীক্ষার নেতৃত্বে ছিলেন ইরির এম. জয়নুল আবেদীন, আর মাঠে তা বাস্তবায়ন করেন ব্রির মোশাররফ হোসেন ও অংশগ্রহণকারী কৃষকেরা।
সেই পরীক্ষায় রোপণের তুলনায় ড্রাম সিডারে বোনা ধানে গড়ে ১৮ শতাংশ বেশি ফলন হয়, খরচ কমে ৬ শতাংশ, ফসল গড়ে ১০ দিন আগে পাকে, আর মোট আয় হয় ২১ শতাংশ বেশি। রাইস টুডে লিখেছে, এতে গড় মুনাফা দ্বিগুণের বেশি হয়, অর্থাৎ প্রতি ফসলে হেক্টরপ্রতি প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলার বাড়তি। অংশ নেওয়া কৃষকেরা যন্ত্রটিকে কম খরচের ও কম শ্রমের বলে মনে করেন; তাঁদের দুশ্চিন্তা ছিল যন্ত্র কেনার খরচ, তা পাওয়া যাবে কি না, আর আগাছা।
এরপর দ্রুত ব্যবহার বাড়ে। ড. মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, ২০০৪ সালে ডিএই ইরির সহযোগিতায় প্রায় আড়াই হাজার ড্রাম সিডার আমদানি করে এবং ২০০৫ সালের বোরো মৌসুমে প্রায় ৩০০ উপজেলায় পৌঁছে দেয়; বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফল ছিল খুবই উৎসাহজনক। দেশেই যন্ত্রটি তৈরির চেষ্টাও তখন চলছিল। ব্রির ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, ড্রাম সিডার এখন বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে।
আগ্রহের মূল কারণ ছিল শ্রমিক। রাইস টুডে ২০০৫ সালে লিখেছে, বাংলাদেশে প্রতি মৌসুমে যে ১১ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে ধান হয়, তার প্রায় ৯০ শতাংশই রোপণ করা হয়; এতে সারা দেশে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন শ্রমদিবস লাগে, অথচ গ্রামের শ্রমিকেরা শহরে ও অন্য পেশায় চলে যাচ্ছিলেন। এক হেক্টরে চারা রোপণে ৫০ শ্রমদিবস পর্যন্ত লাগতে পারে; ড্রাম সিডারে লাগে মাত্র দুই শ্রমদিবস।

আমন মৌসুমের পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে
ব্রির গবেষণা মাঠে একই জাতের ধান ড্রাম সিডারে বুনে এবং রোপণ করে তুলনা করা হয়। ব্রির ফ্যাক্ট শিট অনুযায়ী, আমন মৌসুমে ব্রি ধান৩০ বপনে হেক্টরে ৫.৩৫ টন ফলন দেয়, রোপণে ৩.৭৬ টন; অর্থাৎ ৪২ শতাংশ বেশি, আর জীবনকাল ১৪৮ দিন থেকে কমে ১৩২ দিন হয়। ব্রি ধান৩১ বপনে দেয় ৩.৭০ টন, রোপণে ৩.২৫ টন, অর্থাৎ ১৩ শতাংশ বেশি; পাকে ১৩৭ দিনের বদলে ১১৮ দিনে। ব্রি ধান৪১ বপনে ৫.৫০ টন, রোপণে ৪.৪০ টন, অর্থাৎ ২৫ শতাংশ বেশি; সময় লাগে ১৩৯ দিনের বদলে ১২৯ দিন।
২০০৪ সালের আমন এবং ২০০৪ ও ২০০৫ সালের বোরো মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকের মাঠে পরীক্ষা করে ব্রি দেখেছে, রোপণের চেয়ে ফলন গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি হয় এবং ধান ১০ থেকে ১২ দিন আগে কাটা যায়। ব্রির হিসাবে, রোপণের বদলে ড্রাম সিডারে আবাদ করলে আমন মৌসুমে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬ হাজার টাকা এবং বোরো মৌসুমে প্রায় ৮ হাজার টাকা বেশি মুনাফা সম্ভব। এগুলো সে সময়ের পরীক্ষায় পাওয়া ব্রির হিসাব; প্রতিটি জমিতে একই ফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নয়।
উপকরণের খরচও কমে। ড. মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, যে জমিতে চারা তোলা ও রোপণে প্রায় ৪৫ জন শ্রমিক লাগে, সেখানে ড্রাম সিডারে দুজনেই এক হেক্টরে বীজ বুনতে পারেন। একক সরু সারিতে বুনলে হেক্টরে বীজ লাগে মাত্র প্রায় ২৫ কেজি, যা রোপণের জন্য কৃষকেরা সাধারণত যে বীজ ব্যবহার করেন তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ; এতে হেক্টরে প্রায় এক হাজার টাকা সাশ্রয় হয়।
আগাম কাটার সুবিধা আমনেই সবচেয়ে বেশি। ড. মোশাররফ হোসেন উল্লেখ করেন, আমন ধানের প্রজনন পর্যায়ে অক্টোবর-নভেম্বরে খরা দেখা দেয় এবং ফলন কমায়; তাই যে ফসল ১০ থেকে ২০ দিন আগে পাকে, তা খরা এড়াতে পারে। তাঁর হিসাবে, ড্রাম সিডার ব্যবহার করে কৃষক হেক্টরে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় করতে পারেন।
বর্ষায় কোন জমিতে ড্রাম সিডার চলে
আমনের সব জমিতে ড্রাম সিডার উপযোগী নয়। ড. মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, পানি ব্যবস্থাপনা কৃষকের নিয়ন্ত্রণে থাকে বলে বোরো মৌসুমেই এটি সবচেয়ে উপযোগী। আমন মৌসুমে এটি চলে উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে, যেখানে বোনার সময় পানি জমে থাকে না এবং ভারী বৃষ্টিতে সারিতে বোনা অঙ্কুরিত বীজ এলোমেলো হয় না। তাঁর মতে, আমনে ড্রাম সিডারে বোনার উপযুক্ত সময় ১ থেকে ১৫ জুলাই, আর বোরোতে ১ থেকে ১৫ ডিসেম্বর।
বর্ষায় কৃষককে যে ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করতে হবে, ব্রির বপন বিষয়ক ফ্যাক্ট শিটে সেগুলোর তালিকা আছে:
- বোনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারী বৃষ্টি হলে বীজ সারি থেকে এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
- জমি অসমান হলে কিংবা জমিতে পানি জমে থাকলে অঙ্কুর পচে যেতে পারে।
- যে জমিতে বেশি আগাছা জন্মে, সেখানে আগাছানাশক ব্যবহার করা জরুরি হয়ে পড়ে।
- বোনার পর প্রথম সাত দিন পাখি এবং হাঁস-মুরগির উপদ্রব হতে পারে।
- আমন মৌসুমে জমি তৈরির দিনই, আর বোরো মৌসুমে জমি তৈরির পরের দিন বীজ বোনা ভালো।
- আমন মৌসুমে মাঝারি উঁচু জমিতে, বৃষ্টি এড়িয়ে বীজ ফেলতে হবে।
ধাপে ধাপে ড্রাম সিডারে বপন
ব্রির ড. মোশাররফ হোসেন ড্রাম সিডারে সরাসরি ভেজা জমিতে বপনকে জ্ঞাননির্ভর প্রযুক্তি বলেছেন এবং বলেছেন, ব্যবহারের আগে কৃষকের প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি। ব্রির ফ্যাক্ট শিট এবং ২০০৫ সালে তাঁর দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপগুলো এরকম:
- জমি ভালোভাবে তৈরি করুন: চাষ ও মই দিয়ে আগাছা ও অন্যান্য আবর্জনা মাটিতে পচিয়ে নিন এবং জমি কাদা করুন।
- খুব যত্ন করে জমি সমান করুন। জমে থাকা পানিতে অঙ্কুরিত বীজ বুনলে চারা মারা যায় বা অসমানভাবে গজায়, তাই বোনার আগে জমে থাকা পানি বের করে দিন।
- ভালো ও সুস্থ বীজ ব্যবহার করুন। বীজ ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন, তারপর তাপমাত্রা ও মৌসুম অনুযায়ী তিন থেকে পাঁচ দিন জাগ দিন।
- ভালোভাবে অঙ্কুরিত বীজ বুনুন, যার শিকড় (ভ্রূণমূল) প্রায় ৪-৫ মিলিমিটার লম্বা।
- ড্রামে ভরার আগে অঙ্কুরিত বীজ ছায়ায় এক থেকে দুই ঘণ্টা হালকা শুকিয়ে নিন, যাতে বীজ ছিদ্র দিয়ে সহজে ও সমানভাবে পড়ে।
- প্রতিটি ড্রামের দুই-তৃতীয়াংশ অঙ্কুরিত বীজে ভরুন, এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখুন, যাতে বীজ সমানভাবে পড়ে। ছয়টি ড্রামে যন্ত্রটি একসঙ্গে ১২ লাইনে বীজ বোনে; একবার ভরলে মোটামুটি এক একর জমি বোনা যায়।
- যন্ত্রটি সমান গতিতে জমির ওপর দিয়ে টানুন। দুজন মানুষ দিনে এক হেক্টরের বেশি জমিতে বীজ বুনতে পারেন।
পানি ব্যবস্থাপনা রোপা ধানের জমির মতো নয়। ব্রি বলছে, বোনার পর প্রাথমিক অবস্থায় জমিতে দাঁড়ানো পানির দরকার নেই; মাটি রসালো রাখতে হবে এবং চারা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেচের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ড. মোশাররফ হোসেন লিখেছেন, বোনার পর পাঁচ দিন পর্যন্ত সেচের দরকার নেই, আর বাড়ন্ত ফসলের জন্য ৫-৭ সেন্টিমিটার দাঁড়ানো পানিই যথেষ্ট।
ব্রির তথ্যে, সার লাগে রোপা ধানের মতোই, অনুমোদিত মাত্রায়; ইউরিয়া কখন দিতে হবে তা ঠিক করতে লিফ কালার চার্ট (এলসিসি) ব্যবহার করা যায়। নিজের মাটি ও জাতের জন্য অনুমোদিত সারের মাত্রা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
আগাছা: ড্রাম সিডারে বোনা ধানের প্রধান সমস্যা
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আগাছা। ব্রির আগাছা দমন বিষয়ক ফ্যাক্ট শিটে কারণটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে: ড্রাম সিডারে কাদা জমিতে বীজ বোনার পর কিছুদিন পানি দেওয়া হয় না, আর দাঁড়ানো পানি ছাড়া ভেজা মাটিতে আগাছা সহজে গজায় ও বাড়ে। আগাছার উপদ্রব এলাকা ও জমিভেদে আলাদা; ব্রি বলছে, সাধারণত এক ফসলি নিচু জমিতে আগাছা কম হয়।
ব্রি আগাছা দমনকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ, এই দুই ভাগে ভাগ করেছে। পরোক্ষ পদ্ধতিগুলো মূলত প্রতিরোধমূলক:
- অন্য জাত ও আগাছার বীজমুক্ত ভালো বীজ ব্যবহার করুন; আগাছার বীজ মেশানো বীজ আগাছা ছড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ।
- যে জমিতে সাধারণত আগাছা কম জন্মে, তা বাছাই করুন এবং সময়মতো চাষ ও মই দিয়ে আগাছা পচিয়ে ভালোভাবে জমি তৈরি করুন।
- ঠিকমতো বীজ বুনে ঘন ফসল নিশ্চিত করুন; ঘন ধানের জমিতে আগাছা কম হয়।
- চারা বড় হওয়ার পর জমিতে দাঁড়ানো পানি রাখুন, তাতে আগাছা কমে।
প্রত্যক্ষ পদ্ধতি হলো হাতে নিড়ানি, যান্ত্রিক নিড়ানি ও আগাছানাশক। হাতে নিড়ানি সবচেয়ে কার্যকর, তবে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল; ব্রির মতে দুই-তিনটি নিড়ানিই যথেষ্ট। ব্রির খামার যন্ত্রপাতি ও ফলনোত্তর প্রযুক্তি বিভাগ ১৯৮৫ সালে ব্রি উইডার নামে একটি ঠেলা নিড়ানি যন্ত্র উদ্ভাবন করে, যা ড্রাম সিডারের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে; এর প্রস্থ ১২ সেন্টিমিটার। ব্রির ফ্যাক্ট শিট অনুযায়ী, এটি দিয়ে দিনে প্রায় ৫০ শতাংশ জমির আগাছা দমন করা যায়, হাতে নিড়ানোর চার ভাগের এক ভাগ সময় লাগে, আর স্থানীয় ওয়ার্কশপেই এটি তৈরি ও মেরামত করা যায়। আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমেই এটি চলে, তবে কেবল সারিতে বোনা বা সারিতে রোপণ করা জমিতে, এবং জমিতে পানি থাকা দরকার। ফ্যাক্ট শিটে এর দাম লেখা আছে ৫০০ টাকা।
আগাছানাশকের ক্ষেত্রে ব্রির ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, প্রতি ৫ শতক জমিতে ১০ লিটার পানিতে ২০-২৫ মিলিলিটার রনস্টার বা ১০-১২ মিলিলিটার রিফিট মিশিয়ে প্রয়োগ করা যায়। আউশ ও আমন মৌসুমে বোনার চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে আগাছানাশক দেওয়া ভালো। বোরো মৌসুমে বোনার ৭-১০ দিনের মধ্যে জমিতে ছিপছিপে দাঁড়ানো পানি থাকা অবস্থায় প্রয়োগ করতে হয় এবং এর পরও চার-পাঁচ দিন ছিপছিপে পানি রাখতে হয়। ব্রি সতর্ক করেছে, আগাছানাশক সাবধানে ব্যবহার করতে হবে; সময়, মাত্রা ও পানি ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভুল ব্যবহারে চারা মারা যেতে পারে। স্প্রে করার আগে পণ্য ও মাত্রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
ব্রির ফ্যাক্ট শিটে বলা হয়েছে, গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকার কৃষকেরা ড্রাম সিডারে বোনা ধানে মাত্র দুটি হাত নিড়ানি দিয়েই আগাছা দমনে সফল হয়েছেন। ব্রির পরামর্শ: যে জমিতে আগাছা কম হয়, সেখানেই ড্রাম সিডার পদ্ধতি ব্যবহার করুন।
বীজতলা নষ্ট হলে: বর্ষায় ব্রির অন্যান্য বিকল্প
বন্যায় আমনের সময়সূচি এলোমেলো হলে ব্রি যেসব প্রযুক্তির কথা বলে, ড্রাম সিডার তার একটি। বন্যাকবলিত এলাকার লাগসই প্রযুক্তি নিয়ে ব্রির ফ্যাক্ট শিটে এই বিকল্পগুলো দেওয়া আছে:
- রোপা আমন মৌসুমে যেখানে ১২ থেকে ১৬ দিনের বন্যায় জমি তলিয়ে থাকার আশঙ্কা থাকে, সেখানে ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২ চাষ করে সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যেতে পারে।
- বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কাদাময় সমতল জমিতে বিআর১, বিআর১১, বিআর২২, বিআর২৩, নাইজারশাইল প্রভৃতি জাতের অঙ্কুরিত বীজ সরাসরি বোনা যায়; এ ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে (ভাদ্রের মাঝামাঝি) বপন শেষ করতে হবে।
- বন্যার পর নতুন করে চারা রোপণের জন্য আলোক সংবেদনশীল জাত বেছে নিতে হবে, যেমন বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৩৭ ও ব্রি ধান৩৮। বিআর২২, বিআর২৩ ও ব্রি ধান৪৬ জাতের ৩০ থেকে ৫০ দিন বয়সের চারা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি (ভাদ্রের শেষ) পর্যন্ত রোপণ করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। নাবি আমনের ক্ষেত্রে চারার বয়স ৪৫ থেকে ৫০ দিন হলে ভালো হয়।
- বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া বিআর১১, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৮ বা ব্রি ধান৩৯ জাতের ধান যদি পুরোপুরি নষ্ট না হয়, তবে পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন কুশি গজানোর শুরুতে পরিমিত ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করলে ধান আবার সেরে উঠতে পারে।
- বন্যার কারণে আমন রোপণে খুব বেশি দেরি হলে (সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধে বা ভাদ্রের মধ্যে) ব্রি বরং আগাম বোরো চাষের কথা ভাবতে বলে, নভেম্বরের মাঝামাঝি (কার্তিকের শেষে) চারা করে।
বন্যার পানিতে বীজতলা করার মতো উঁচু জমি না থাকলে, কিংবা পানি নামার পর চারা তৈরির যথেষ্ট সময় না পেলে, ব্রি ভাসমান বীজতলার কথা বলে। বন্যার পানি, পুকুর, ডোবা বা খালের পানির ওপর বাঁশের চাটাইয়ের মাচা বা কলাগাছের ভেলা তৈরি করে তার ওপর ২-৩ সেন্টিমিটার পুরু কাদার আস্তর দেওয়া হয়, তারপর সাধারণ কাদাময় বীজতলার মতো অঙ্কুরিত বীজ ফেলা হয়। বীজতলা যাতে ভেসে না যায়, সেজন্য খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখতে হয়; পানিতে ভাসমান থাকায় এতে সাধারণত সেচের দরকার হয় না।
ড্রাম সিডার ব্যবহার করতে চাইলে, কিংবা বন্যার পর পরামর্শের দরকার হলে, কৃষক ডিএইর উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। আরও তথ্যের জন্য ব্রির ফ্যাক্ট শিটে পরিচালক (গবেষণা), ব্রি, গাজীপুর-১৭০১ ঠিকানার উল্লেখ আছে।

ছবি: SEJustice / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) রাইস নলেজ ব্যাংক ও ফ্যাক্ট শিট, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (রাইস টুডে, রাইস নলেজ ব্যাংক), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া




মন্তব্য
(০)