চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার প্রথম মাশরুম চাষি হিসেবে পরিচিত আবুল কাশেম ইউটিউবে ভিডিও দেখে মাশরুম চাষ শুরু করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ষাটোর্ধ্ব এই চাষি উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলী গ্রামের বাসিন্দা। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৫ সালের ৮ মার্চ তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এলাকায় নতুন কেউ মাশরুম চাষে আগ্রহী হলে তাঁর কাছ থেকেই পরামর্শ ও সহযোগিতা নেন, আর তিনি হাতে-কলমে প্রাথমিক প্রশিক্ষণও দেন।
প্রবাস থেকে ফিরে নতুন পথের খোঁজ
আবুল কাশেম প্রায় তিন দশক দুবাইয়ে ছিলেন। দেশে ফিরে জীবিকার উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কখনো নার্সারি, কখনো দোকান দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টায় কেটে যায় ৯ বছর, কিন্তু সেসব উদ্যোগ সফল হয়নি। হতাশার এক পর্যায়ে মাশরুম চাষের ভিডিও দেখে ২০২২ সালে তিনি এ কাজে নামেন।
এবার তিনি প্রশিক্ষণ নিয়ে ভালোভাবে শুরু করতে চেয়েছিলেন। প্রথমে রিফা মাশরুম প্রজেক্টের এক দিনের মাশরুম চাষ প্রশিক্ষণ নেন। পরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ইমপর্টেন্স অব মাশরুম অ্যান্ড কাল্টিভেশন টেকনিক’ বিষয়ে ১০ দিনের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে চাষ শুরু করেন।

খামারের উৎপাদন ও আয়
মিরসরাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ২০২৫ সালের মার্চে তাঁর ৪৪ ফুট বাই ২৪ ফুট আয়তনের মাশরুম প্রকল্প ছিল, যার সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৬ লাখ টাকা। খামারে তখন ১ হাজার স্পন প্যাকেট ছিল এবং প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ কেজি মাশরুম উৎপাদন হতো। প্রতি কেজি তিনি ৩০০ টাকায় বিক্রি করতেন। ক্রেতার চাহিদা অনেক থাকলেও উৎপাদন কম হওয়ায় সবাইকে সরবরাহ করতে পারছিলেন না। জাগো নিউজের হিসাবে সব খরচ বাদ দিয়ে তাঁর মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা আয় হতো।
আবুল কাশেম বলেন, ‘আমি ৩০ বছর দুবাই ছিলাম। দেশে ফিরে কী করবো ভাবতে ভাবতে ইউটিউবে মাশরুম চাষের ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হলাম। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও মিরসরাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় মাশরুম চাষের ওপর ট্রেনিং নিই। ট্রেনিং নেওয়ার পর মাশরুম চাষ খুবই সহজ হয়ে যায়। বর্তমানে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করছি।’ তিনি জানান, নতুন কেউ আগ্রহী হলে তাঁদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করেন।
মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় মাশরুম চাষকে খুবই সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় উদ্যোক্তা আবুল কাশেমকে আমরা মাশরুম উৎপাদন ঘর, চাষ ঘর, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, ভ্যান দিয়েছি।’ তিনি আরও জানান, কোনো উদ্যোক্তা মাশরুম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতে চাইলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশে মাশরুম চাষ কীভাবে হয়
বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে বাণিজ্যিক মাশরুম চাষ শুরু হয় ১৯৮০-র দশকের শুরুতে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল এবং পরে সাভারের মাশরুম কালচার সেন্টারের উদ্যোগে। এ দেশে ঝিনুক বা অয়েস্টার মাশরুমই সবচেয়ে প্রচলিত ও জনপ্রিয়। এর চাষে মূল উপকরণ ধানের খড়, তুষ, কাঠের গুঁড়া ও অন্যান্য কৃষি উচ্ছিষ্ট; পলিথিনের প্যাকেটে এগুলো ভরে বীজ বা স্পন দেওয়া হয়। বিশুদ্ধ মাশরুম চাষে স্পন অপরিহার্য। বীজ দেওয়ার ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ফসল তোলা যায়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২১ সালের মার্চের এক প্রতিবেদনে সাভারের মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বরাতে বলা হয়, দেশে বছরে ৪০ হাজার টনের বেশি মাশরুম উৎপাদন হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় লাখ মানুষ এ চাষে যুক্ত। দেশের আবহাওয়ায় অয়েস্টার ও মিল্কি মাশরুমের উৎপাদনই বেশি।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, মিরসরাই উপজেলার আয়তন ৪৮২.৮৮ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং দক্ষিণে সীতাকুণ্ড উপজেলা ও বঙ্গোপসাগর। ফেনী নদী ছাড়াও হিঙ্গুলী, মহামায়া ও ইছাখালী খাল এ উপজেলার উল্লেখযোগ্য জলাশয়। এখানকার প্রধান ফসল ধান, ডাল, আলু, বেগুন ও শাকসবজি।

ছবি: Biscutella / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (মাশরুম; মিরসরাই উপজেলা), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড




মন্তব্য
(০)