পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ এলাকার কৃষকদের জন্য সৌরশক্তিতে চলা একটি ভ্রাম্যমাণ সেচপাম্প তৈরি করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৫ সালের ৪ মে জানায়, শুষ্ক মৌসুমে জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য তৈরি এই পাম্প এমনভাবে বানানো যে সহজেই যে কোনো জায়গায় বসিয়ে পুকুর, খাল কিংবা জলাধার থেকে সৌরবিদ্যুতে পানি তুলে জমিতে দেওয়া যায়। এরই মধ্যে স্থানীয় কৃষকদের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আকারভেদে এমন একটি সেচপাম্প তৈরিতে ৭ থেকে ৯ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।
কলাপাড়া পটুয়াখালী জেলার উপকূলীয় একটি উপজেলা, আয়তন ৪৯১ দশমিক ৮৯ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এখানে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯৯৩ জন মানুষের বাস। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের একটি নীলগঞ্জ; আন্ধারমানিক, নীলগঞ্জ ও ধানখালী এখানকার প্রধান নদী। সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটাও এই উপজেলায়।

চালক ও কৃষকের অভিজ্ঞতা
সেচপাম্পটির চালক মো. সজিব জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এখন প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাম্প চালাই। যারা পানি নেন, তারা খুশি। তাদের খরচ কমেছে, আমারও কিছু আয় হচ্ছে।’ পাম্পটি একটি অটোরিকশায় বসানো। সজিব জানান, সেচের কাজ না থাকলে তিনি এই অটোরিকশাতেই যাত্রী ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য পরিবহন করেন; মৌসুমের শুরুতে সার ও বীজ আনা-নেওয়ার জন্যও কৃষকেরা তাকে ডাকেন।
স্থানীয় কৃষক নিতাই চন্দ্র বলেন, ‘জমিতে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হলে সজিবকে (সেচপাম্পের চালক) ফোন দিলেই সে তার পাম্প নিয়ে পৌঁছে যায়। খালের পাড়ে কিংবা পুকুর পাড়ে মেশিন বসিয়ে দিলে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পানি উঠতে থাকে। এখানে যেমন ব্যয় কম হয়, তেমনি পরিবহনসহ অন্যান্য বিষয়ে ঝামেলা নেই।’

ব্র্যাকের ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচব্যবস্থা
ব্র্যাকের ক্লাইমেট চেঞ্জ প্রোগ্রামের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার তৌসিফ আহমেদ কুরাইশি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকরা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। এই সৌরচালিত সেচ প্রযুক্তি শুধু তাদের কৃষিকাজ সহজ করছে না বরং খরচ কমিয়ে আয়ের নতুন পথ তৈরি করছে।’ তিনি জানান, ধাপে ধাপে প্রযুক্তিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ব্র্যাক।
এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে ব্র্যাকের ক্লাইমেট চেঞ্জ প্রোগ্রামের কর্মকর্তাদের লেখা এক নিবন্ধে এই ব্যবস্থার বিবরণ দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, ব্র্যাকের অ্যাডাপটেশন ক্লিনিক প্রকল্প পটুয়াখালী, জামালপুর ও সাতক্ষীরায় মোট চারটি ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচব্যবস্থা দিয়ে কৃষকদের সেচ দিয়েছে। প্রতিটিতে রয়েছে ৩ দশমিক ৩ কিলোওয়াটের সোলার প্যানেল, ৩ কিলোওয়াটের হাইব্রিড এমপিপিটি নিয়ন্ত্রক এবং ৩ হর্সপাওয়ারের সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প, পাইপের ব্যাস ৩ ইঞ্চি। বহনযোগ্য হওয়ায় এক মৌসুমে পাম্পটি পাঁচ-ছয়টি জায়গায় ব্যবহার করা যায়, প্রতিটি জায়গায় অন্তত ১৮ থেকে ২০ জন কৃষক এর সুবিধা পান। একজন কৃষককে বেছে নিয়ে পাম্প চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়; তিনি প্রচলিত সেচের খরচের মোটামুটি ৩০ শতাংশ ভাড়ায় সেচ দেন।

ডিজেলনির্ভর সেচ ও সৌর পাম্প
বাংলাদেশে সেচের বড় অংশ তখনো ডিজেলচালিত পাম্পে হতো। পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মোঙ্গাবে ২০২৪ সালের মে মাসে জানায়, দেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ১ দশমিক ৬ শতাংশ আসে ডিজেল পাম্প থেকে, আর কৃষির মোট খরচের ৪৩ শতাংশ যায় সেচে। ইডকল তত দিনে দেশে ২ হাজার ২২৬টি সৌর সেচপাম্প বসিয়েছিল এবং সরকারের পরিকল্পনা ছিল ৪৫ হাজার সৌর পাম্প দিয়ে ২ লাখ ডিজেল পাম্পের জায়গা নেওয়া। একই প্রতিবেদনে কৃষকেরা অভিযোগ করেন, রাতে বা কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে সৌর পাম্প চলে না বলে তারা সময়মতো পানি পান না। খাল ও পুকুরের পাড়ে সরিয়ে নেওয়া যায় বলে একটি ভ্রাম্যমাণ পাম্প এক মৌসুমে একাধিক জায়গার কৃষকের কাজে লাগে।
ছবি: বিদ্যুৎ বিভাগ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, মোঙ্গাবে, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)