সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ফুলকপির কোরমা: দই ও নারকেল দিয়ে ঘরোয়া রেসিপি, ধাপে ধাপে

২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি জাগো নিউজ ২৪ পেঁয়াজ, আদা, রসুন, টমেটো ও গুঁড়া মসলায় রান্না করে দই ও নারকেলে নরম করা ফুলকপির কোরমার একটি ঘরোয়া রেসিপি প্রকাশ করে, যা ভাত বা রুটির সঙ্গে খাওয়ার পদ।

ফুলকপির কোরমা: দই ও নারকেল দিয়ে ঘরোয়া রেসিপি, ধাপে ধাপে
রান্নাবান্না

২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগ ফুলকপির কোরমার একটি ঘরোয়া রেসিপি প্রকাশ করে। এতে ফুলকপির টুকরো পেঁয়াজ, আদা, রসুন, টমেটো ও গুঁড়া মসলার মিশ্রণে রান্না করে শেষে দই ও নারকেল দিয়ে নরম করা হয়। প্রকাশকের বর্ণনায় পদটি নরম, হালকা ও সুস্বাদু; ভাত বা রুটির সঙ্গে খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তারা লিখেছিল, সব বয়সের মানুষই এটি পছন্দ করবে।

রেসিপিটি প্রকাশিত হয় জানুয়ারিতে, অর্থাৎ রবি বা শীত মৌসুমে, যে মৌসুমে বাংলাদেশে ফুলকপির চাষ হয়। এই প্রতিবেদনে প্রথমে জাগো নিউজের দেওয়া উপকরণ ও পরিমাণসহ রান্নার ধাপগুলো তুলে ধরা হলো। এরপর কোরমা আসলে কী, ফুলকপি কোথা থেকে এসেছে, বাংলাদেশে এটি কখন ও কীভাবে চাষ হয়, দেশে কতটা উৎপাদন হয় এবং সরকারি খাদ্য উপাদান তালিকা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উপকরণগুলো, স্বাস্থ্যকর খাবার ও নিরাপদ রান্না নিয়ে কী বলে, তা ব্যাখ্যা করা হলো।

উপকরণ


জাগো নিউজ ২৪ নিচের উপকরণগুলোর তালিকা দিয়েছিল। পদটি কতজনের জন্য, রেসিপিতে তা বলা হয়নি।

  • ফুলকপি: মাঝারি আকারের ১টি, টুকরো করে কাটা
  • পেঁয়াজ: মাঝারি ২টি, কুচি করে কাটা
  • রসুন: ৪-৫ কোয়া, বাটা
  • আদা: ১ চা চামচ
  • টমেটো পেস্ট: ১ কাপ
  • কুড়ানো নারকেল বা নারকেল ক্রিম: ৩ টেবিল চামচ
  • দই: ২ টেবিল চামচ
  • ধনে গুঁড়া: ১ চা চামচ
  • জিরা গুঁড়া: আধা চা চামচ
  • লবণ: স্বাদমতো
  • তেল: ২-৩ টেবিল চামচ
  • পানি: প্রয়োজনমতো
  • ধনে পাতা: সাজানোর জন্য

তালিকায় নারকেলের ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প রাখা হয়েছে: কুড়ানো নারকেল অথবা নারকেল ক্রিম, যেকোনোটি ৩ টেবিল চামচ। ভূমিকায় প্রকাশক মসলা, নারকেল ও ক্রিমের স্বাদ এক হয়ে ওঠার কথা লিখলেও তালিকায় আলাদা করে ক্রিম নেই; পদের ঘন, মোলায়েম ভাবটি আসে দই ও নারকেল থেকে। কোন তেল ব্যবহার করতে হবে, রেসিপিতে তা বলা নেই। তালিকা ও রান্নার পদ্ধতির মধ্যে দুটি ছোট পার্থক্যও চোখে পড়ে: তালিকায় ১ কাপ টমেটো পেস্টের কথা আছে, কিন্তু পদ্ধতিতে শুধু টমেটো লেখা; আর আদা ১ চা চামচ দেওয়া হলেও তা বাটা না কুচি, বলা হয়নি। রেসিপিতে হলুদ, মরিচ বা গরম মসলা নেই; প্রকাশক পদটিকে হালকা বলে বর্ণনা করেছে।

রান্নার ধাপ


রান্নার পদ্ধতির চারটি পর্ব: পেঁয়াজ ভেজে মসলার ভিত তৈরি, টমেটো ও গুঁড়া মসলা কষানো, ফুলকপি ভাজা, তারপর দই ও নারকেল দিয়ে ঢেকে নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না। জাগো নিউজের দেওয়া ধাপগুলো এরকম:

  • ফুলকপি টুকরো টুকরো করে কেটে ধুয়ে নিন।
  • একটি প্যানে তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
  • আদা ও রসুন দিয়ে ১-২ মিনিট ভাজুন, যেন কাঁচা গন্ধ চলে যায়।
  • টমেটো, ধনে গুঁড়া ও জিরা গুঁড়া দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন।
  • ফুলকপি দিয়ে ৫ মিনিট ভাজুন।
  • ভাজা হলে দই ও নারকেল দিন।
  • প্রয়োজনে একটু পানি দিয়ে ঢাকনা দিন এবং ১০ মিনিট রান্না করুন, যেন ফুলকপি নরম হয়ে আসে।
  • সবশেষে স্বাদমতো লবণ দিয়ে হালকা নেড়ে দিন।
  • কোরমা রান্না হয়ে গেলে ধনে পাতা ছিটিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

অর্থাৎ পেঁয়াজ, আদা, রসুন, টমেটো ও গুঁড়া মসলা কষানো শেষ হওয়ার পরই ফুলকপি দেওয়া হয়। পাঁচ মিনিট ভাজার পর দই, নারকেল আর যতটুকু দরকার ততটুকু পানি দিয়ে ঢেকে প্রায় দশ মিনিট রান্না হয়। লবণ পড়ে একেবারে শেষে। ফলে ফুলকপির রান্নার সময় রেসিপিতে খুব বেশি নয়, আর প্রকাশকের নিজের বর্ণনায় তৈরি পদটি একটি নরম, হালকা কোরমা, যা ভাত বা রুটির সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করার কথা।

কোরমা কী: মোগল রান্নাঘর থেকে বাঙালির ভোজে


ইংরেজি উইকিপিডিয়ার বর্ণনায় কোরমা (কুরমা, কোর্মা বা কোরমাহ নামেও লেখা হয়) ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত একটি তরকারি, যার ওপর মোগলাই রান্নার প্রভাব রয়েছে। এতে মাংস বা সবজি দই, পানি বা স্টক এবং মসলার সঙ্গে ধীরে রান্না (ব্রেইজ) করে ঘন ঝোল তৈরি করা হয়। রন্ধনবিষয়ক লেখক পুষ্পেশ পন্তের বরাত দিয়ে নিবন্ধটি বলছে, অন্য আমিষ পদের তুলনায় কোরমার স্বাদ কম ঝাঁঝালো, আর সুগন্ধ বেশি।

ইংরেজি নামটি হিন্দি-উর্দু 'কোরমা' শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ব্রেইজ করা, অর্থাৎ এই পদে যে রান্নার কৌশল ব্যবহৃত হয়। একই নিবন্ধ অনুযায়ী, এই শব্দ এবং ফারসি 'ঘোরমে' ও তুর্কি 'কাভুরমা'র মতো পদের নাম শেষ পর্যন্ত ভাজা জিনিস অর্থের একটি তুর্কি শব্দ থেকে এসেছে, যদিও কোরমা আর আধুনিক তুর্কি কাভুরমা একেবারে আলাদা পদ। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া ফারসি থেকে বাংলায় আসা খাদ্যবিষয়ক শব্দের তালিকায় কালিয়া, কোপ্তা, পোলাও, বিরিয়ানি ও কাবাবের পাশে কোর্মাকেও রেখেছে।

মোগল দরবারের রান্নাঘরে কোরমা তৈরি হতো। খাদ্য-ইতিহাসবিদ নেহা ভার্মানির বরাত দিয়ে উইকিপিডিয়া লিখেছে, মোগল সম্রাট শাহ আলমের শাসনামলের রান্নার বইয়ে পদটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়; আর অষ্টাদশ শতকে মোগল দরবারের বাবুর্চিরা ফারসি ধাঁচের এই ঝোলে বাদাম, রসুন, মসলা ও দই যোগ করে একে আরও সমৃদ্ধ করেন। উনিশ শতকে লখনৌয়ের একটি কোরমায় ঘি, দই, ক্রিম, বাটা বাদাম, লবঙ্গ, এলাচ ও জাফরান ছিল; অন্যদিকে ১৮৬৯ সালের একটি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কোরমায় ক্রিম, বাদাম ও জাফরান বাদ দিয়ে তখনকার ব্রিটিশ তরকারির প্রচলিত মসলা ধনে, আদা ও গোলমরিচ যোগ করা হয়।

নিবন্ধের ব্যাখ্যায়, প্রচলিত পদ্ধতিতে মাংস বা সবজি প্রথমে উচ্চ তাপে দ্রুত রান্না করা হয়, ঐতিহ্যগতভাবে ঘিয়ে, তারপর খুব কম তরল দিয়ে ভাপে দীর্ঘ সময় ধীরে রান্না হয়; শেষ পর্যায়ে হাঁড়ির মুখ আটার লেই দিয়ে আটকে দেওয়া হতে পারে, যাকে দম বলে। শেষে কখনো মাখন বা ক্রিম দেওয়া হয়। আধুনিক বাংলাদেশি রান্নায় কেউ কেউ দইয়ের বদলে ঘন ইভাপোরেটেড দুধ ব্যবহার করেন বলেও নিবন্ধে উল্লেখ আছে। সবজির কোরমাও আছে: 'নবরত্ন কোরমা', অর্থাৎ নয় রত্ন, তৈরি হয় সবজি আর পনির বা বাদাম দিয়ে, প্রায়ই নয় রকম সবজিতে। ইন্দোনেশিয়ায় কোরমা ঐতিহ্যগতভাবে দইয়ের বদলে নারকেলের দুধে রান্না হয়, আর যুক্তরাজ্যের কারি হাউসগুলোর সাধারণ কোরমা হালকা মসলার ঘন ঝোলের পদ, যাতে প্রায়ই কাঠবাদাম, কাজুবাদাম বা অন্য বাদাম এবং নারকেল থাকে। দই ও নারকেল দুটোই আছে, কিন্তু ঝাঁঝালো মসলা নেই, জাগো নিউজের রেসিপিটি তাই এসব ধারার মাঝামাঝি।

বাংলাদেশে কোরমা দীর্ঘদিন ধরে ভালো খাবারের পদ। দই নিয়ে বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধ বলছে, কোরমা, রেজালা ও দইবড়ার মতো রান্নায় টক দই অপরিহার্য; দুগ্ধজাত পণ্য নিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, পোলাও, বিরিয়ানি, রোস্ট ও কোরমার মতো পদে ঘি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাকরখানি নিয়ে নিবন্ধে কোরমাকে মিষ্টি স্বাদের মাংস বা মাছের তরকারি বলে বর্ণনা করে লেখা হয়েছে, মানুষ একসময় সকালের নাশতায় বাকরখানির সঙ্গে কোরমা খেত; আর উৎসব নিয়ে নিবন্ধে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের খাবারের তালিকায় কোরমা ও পোলাওয়ের নাম আছে।

ভারতে তোলা পটলের কোরমার ছবি; দই, পেঁয়াজ ও মসলা দিয়ে রান্না সবজির কোরমা। ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ভারতে তোলা পটলের কোরমার ছবি; দই, পেঁয়াজ ও মসলা দিয়ে রান্না সবজির কোরমা। ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ফুলকপি: পরিচয় ও উৎপত্তি


ফুলকপি সরিষা বা বাঁধাকপি গোত্রের (ক্রুসিফেরি, যাকে ব্রাসিকেসিও বলা হয়) উদ্ভিদ Brassica oleracea প্রজাতির একটি চাষকৃত রূপ, ভ্যারাইটি botrytis। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এটি শীতকালীন ফসল, যার পুষ্পমঞ্জরি একটি ঘনবদ্ধ, মাংসল পিণ্ড তৈরি করে; এটি কাঁচা বা রান্না করা সবজি হিসেবে এবং কখনো আচারে ব্যবহৃত হয়। প্রধান কাণ্ডের মাথায় অপরিণত ফুলের কুঁড়ি গায়ে গায়ে জমাট বেঁধে যে সাদা মাথা তৈরি করে, ইংরেজিতে তাকে 'কার্ড' বলা হয়, আর সাধারণত এই অংশটুকুই খাওয়া হয়। ইংরেজি নাম 'কলিফ্লাওয়ার' এসেছে ইতালীয় 'কাভোলফিওরে' থেকে, যার অর্থ বাঁধাকপির ফুল; মূল লাতিন শব্দ caulis (বাঁধাকপি) ও flos (ফুল)।

ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, বাছাই করে প্রজননের মাধ্যমে, সম্ভবত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এবং সম্ভবত ব্রকলি থেকে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ফুলকপির উদ্ভব। মধ্যযুগে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের আরব উদ্ভিদবিদ ইবনুল আওয়াম ও ইবনুল বায়তার এর উৎপত্তিস্থল হিসেবে সাইপ্রাসের কথা বলেছেন, আর ষোড়শ শতকের বেশ কিছু সময় পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপে সাইপ্রাস থেকে ফুলকপির বীজের ব্যাপক বাণিজ্য চলত। ধারণা করা হয়, ১৪৯০ সালের দিকে সাইপ্রাস বা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উপকূল থেকে এটি ইতালিতে আসে এবং পরের শতকগুলোতে ইউরোপের অন্য দেশে ছড়ায়। বাংলাপিডিয়ার বাংলা সংস্করণও বলছে, সম্ভবত সাইপ্রাসে এর প্রথম উদ্ভব, পরে তা গোটা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে, বিশেষত ইতালিতে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশরা ১৮২২ সালে ভারতে ফুলকপি নিয়ে আসে।

একই নিবন্ধ ফুলকপিকে চারটি প্রধান দলে ভাগ করেছে: ইতালীয়; উত্তর ইউরোপের বর্ষজীবী জাত, যার মধ্যে পুরোনো জাত স্নোবল আছে; উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের দ্বিবর্ষজীবী জাত; এবং উনিশ শতকে ভারতে উদ্ভাবিত এশীয় বা ক্রান্তীয় দল, যার মধ্যে পুরোনো জাত আর্লি বেনারস ও আর্লি পাটনা রয়েছে। সাদা ছাড়াও কমলা, সবুজ ও বেগুনি রঙের ফুলকপি আছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিসংখ্যান ভান্ডার ফাওস্ট্যাটের বরাত দিয়ে নিবন্ধটি জানিয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বে ফুলকপির উৎপাদন, যা ব্রকলির সঙ্গে একত্রে হিসাব করা হয়, ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ টন, যার ৭২ শতাংশই উৎপাদন করেছে চীন ও ভারত।

বাংলাদেশে ফুলকপির জাত ও চাষ


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের ফুলকপির চাষ হয়। আগাম জাতের মধ্যে কার্তিকা, পাটনাই ও ট্রপিক্যাল-৫৫; মধ্য-মৌসুমি জাতের মধ্যে অগ্রহায়ণী, পৌষালি ও স্নোবল; আর নাবি জাতের মধ্যে হোয়াইট মাউন্টেন, মাঘী ও নাবি-রাক্ষসী উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ১৯৯৮ সালে 'রূপা' নামে একটি উচ্চফলনশীল মধ্য-মৌসুমি জাত উদ্ভাবন করে। জ্ঞানকোষটি হেক্টরপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ টন ফলনের কথা বলেছে, অক্টোবর-নভেম্বরে রোপণের জন্য ৩০ দিন বয়সী চারা উপযোগী বলেছে, আর এর বাংলা সংস্করণ যোগ করেছে, দেশের সর্বত্র চাষ হলেও সবচেয়ে বড় জাতের ফুলকপি জন্মে টাঙ্গাইল জেলায়।

সরকারি পরামর্শ সেবা বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বিএএমআইএস) বারির 'কৃষি প্রযুক্তি হাতবই' (৬ষ্ঠ সংস্করণ, সেপ্টেম্বর ২০১৭) থেকে বারির দুটি জাতের বিবরণ দিয়েছে। বারি ফুলকপি-১, যার জনপ্রিয় নাম রূপা, একটি আগাম উচ্চফলনশীল জাত; গড় জীবনকাল প্রায় ১০০ দিন, ফুলের ওজন ৮৫০ থেকে ১০০০ গ্রাম, ফুলকপি চারদিকে পাতা দিয়ে আংশিক ঢাকা থাকে, আর জাতটি সারা দেশে চাষের উপযোগী। বারি ফুলকপি-২ আগাম জাত, গড় জীবনকাল প্রায় ৬৫ দিন, ফুলের ওজন ৭৫০ থেকে ৮০০ গ্রাম। দুটি জাতেরই ফলন হেক্টরপ্রতি ২৫ থেকে ২৮ টন, বা শতকপ্রতি ১০০ থেকে ১১২ কেজি; উপযোগী জমি মাঝারি উঁচু, মাটি দোআঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ, মৌসুম রবি।

রূপার জন্য হাতবইয়ের পরামর্শ, ভাদ্র-আশ্বিনে (মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর) বীজ বোনা এবং কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণে (মধ্য নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর) জমিতে চারা রোপণ; রোপণের ৬০ থেকে ৭৫ দিন পর ফসল তোলা হয়। বীজতলায় চারা তৈরি করে প্রায় ৩০ দিন বয়সে জমিতে লাগানো হয়; রোপণের সময় খেয়াল রাখতে হয় শিকড় যেন মুচড়ে বা বেঁকে না যায়, আর প্রথম কয়েক দিন প্রখর রোদে চারা যেন ঝিমিয়ে না পড়ে সে জন্য কাগজ বা কলার খোল দিয়ে ছায়া দিতে হয়। বিএএমআইএসের পাতায় বলা হয়েছে, ঠান্ডা ও আর্দ্র জলবায়ুতে ফুলকপির ভালো ফলন হয়, আর পানি জমে না এমন উর্বর দোআঁশ ও এঁটেল মাটিতে, যেখানে সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধা আছে, এর চাষ ভালো হয়। রোপণের পর প্রথম ৪-৫ দিন একদিন পরপর, পরে ৮-১০ দিন অন্তর বা প্রয়োজনমতো সেচ দেওয়া, জো এলে মাটির চটা ভেঙে দেওয়া, জমি আগাছামুক্ত রাখা এবং সারের উপরি প্রয়োগের পর অবশ্যই সেচ দেওয়ার পরামর্শও সেখানে আছে।

একই হাতবই হেক্টরপ্রতি ১০ টন কম্পোস্ট, ২০০ কেজি ইউরিয়া, ১৫০ কেজি টিএসপি, ১৫০ কেজি পটাশ (এমওপি), ১০০ কেজি জিপসাম ও ১০ কেজি দস্তা সার কয়েক কিস্তিতে প্রয়োগের সুপারিশ করেছে; শুরুতে বোরন সার না দিলে পরে বোরিক পাউডার পানিতে গুলে পাতায় স্প্রে করার কথাও বলেছে। সেখানে এটাও বলা আছে যে জমির উর্বরতা, মাটির ধরন বা মাটি পরীক্ষার ফল অনুযায়ী সারের মাত্রা কমবেশি করতে হবে, তাই নিজের জমির প্রয়োজন জানতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পাবনার একটি খেতে পাতার মাঝে ফুলকপি। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পাবনার একটি খেতে পাতার মাঝে ফুলকপি। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দেশে ফুলকপির উৎপাদন কত


২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাওয়া সর্বশেষ সরকারি হিসাব ছিল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) 'ইয়ারবুক অব এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৪', যা ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত হয়। ৩৬তম সংকলনের এই বর্ষগ্রন্থে ১৪৬টি ফসলের আবাদি জমি ও উৎপাদনের বার্ষিক প্রাক্কলন দেওয়া হয়।

বর্ষগ্রন্থের শীতকালীন (রবি) সবজির সারণি অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ফুলকপির আবাদ হয়েছিল ৫৮,১২৯.৩৩ একর জমিতে, উৎপাদন ৪,২৯,৬৭০.১০ মেট্রিক টন। আগের বছর, ২০২২-২৩ সালে এই হিসাব ছিল ৫৬,৪৪৬.৯৪ একর ও ৩,৪৩,৭৫৮.৭১ টন, আর ২০২১-২২ সালে ৫৬,৪২৬.৬১ একর ও ৩,৪২,৩০৬.০৩ টন। একই ২০২৩-২৪ সালের সারণিতে টমেটোর উৎপাদন ৪,৯১,৪৮৭.৭৯ টন, রবি বেগুনের ৪,৮৫,০৫২.৮৬ টন এবং বাঁধাকপির ৪,৫০,০২৩.৯৩ টন; তালিকাভুক্ত সব শীতকালীন সবজি মিলিয়ে উৎপাদন ৩৯,৫৩,৬৯৭.২৫ টন, আবাদি জমি ৭,৬৯,৯৮৩.৩৪ একর।

বাংলাপিডিয়ার ফুলকপি নিবন্ধে প্রায় ৯,৪০০ হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ৭৩,০০০ টন উৎপাদনের একটি পুরোনো, তারিখবিহীন হিসাব রয়েছে।

ঢাকায় বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা ফুলকপি। ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
ঢাকায় বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা ফুলকপি। ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

খাদ্য উপাদান তালিকায় ফুলকপি ও নারকেল


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (আইএনএফএস) ২০১৩ সালের জুনে 'ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ' প্রকাশ করে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ফুড পলিসি ক্যাপাসিটি স্ট্রেংদেনিং প্রোগ্রাম, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও ইউএসএআইডির সহায়তায় তৈরি এই তালিকায় প্রতিটি খাবারের খাওয়ার উপযোগী অংশের প্রতি ১০০ গ্রামের পুষ্টিমান দেওয়া আছে।

কাঁচা ফুলকপির ক্ষেত্রে তালিকায় খাওয়ার উপযোগী অংশের সহগ ০.৪৫, অর্থাৎ কেনা খাবারের যে অংশ আসলে খাওয়া হয় তার মাপ; ফুলকপির পাতা ও মোটা ডাঁটা সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। খাওয়ার উপযোগী অংশের প্রতি ১০০ গ্রামে আছে ২৭ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ৯১.৮ গ্রাম পানি, ২.৬ গ্রাম আমিষ, ০.৩ গ্রাম চর্বি, ২.৫ গ্রাম শর্করা, ২.০ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ৩৩ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৮ মিলিগ্রাম আয়রন, ২৯৯ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ২০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ৫৭ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট এবং ৭২.৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। বাংলাপিডিয়া ফুলকপিকে ভিটামিন এ, সি ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ বলেছে; আইএনএফএসের তালিকায় ভিটামিন সি-র তথ্য তার সঙ্গে মেলে, কিন্তু ভিটামিন এ প্রতি ১০০ গ্রামে মাত্র ১ মাইক্রোগ্রাম রেটিনল অ্যাক্টিভিটি ইকুইভ্যালেন্ট।

তালিকায় লবণ ছাড়া সেদ্ধ ফুলকপির মানও আছে: প্রতি ১০০ গ্রামে ২৮ কিলোক্যালরি, ২.৭ গ্রাম আমিষ, ৪৬.৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৩২ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট ও ২১৪ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম। সেদ্ধ ফুলকপির ভিটামিন সি, ফোলেট ও পটাশিয়ামের এই মান কাঁচা ফুলকপির জন্য দেওয়া মানের চেয়ে কম। বিএএমআইএস কৃষি তথ্য সার্ভিসের 'কৃষি ডায়েরি ২০১৭' থেকে যে পুষ্টিমান উদ্ধৃত করেছে, তা ভিন্ন (যেমন প্রতি ১০০ গ্রামে ৪১ কিলোক্যালরি ও ৪১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম); নমুনা ও উৎসভেদে পুষ্টিমানে এমন পার্থক্য দেখা যায়।

রেসিপির নারকেল খাদ্যশক্তিতে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। আইএনএফএসের তালিকা অনুযায়ী, পরিপক্ব নারকেলের শাঁসের প্রতি ১০০ গ্রামে ৩৮৯ কিলোক্যালরি ও ৩৬.৭ গ্রাম চর্বি, আর নারকেলের দুধে ২১৩ কিলোক্যালরি ও ২১.৭ গ্রাম চর্বি থাকে। রেসিপিতে একটি মাঝারি ফুলকপির জন্য নারকেল ৩ টেবিল চামচ, সঙ্গে তেল ২-৩ টেবিল চামচ।

স্বাস্থ্যকর খাবার ও নিরাপদ রান্না


২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনলাইনে থাকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক ফ্যাক্টশিটে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন অন্তত ৪০০ গ্রাম, বা পাঁচ পরিবেশন, ফল ও সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল; এই হিসাবে আলু, মিষ্টি আলু, কাসাভা ও অন্যান্য শ্বেতসারপ্রধান মূল ধরা হয় না। সেখানে প্রতিবেলার খাবারে সবজি রাখা এবং মৌসুমি ফল ও সবজি খাওয়ার কথাও বলা হয়। দিনে ৫ গ্রামের কম, অর্থাৎ প্রায় এক চা চামচ লবণ খাওয়া, আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করা এবং মোট খাদ্যশক্তির ৩০ শতাংশের কম চর্বি থেকে নেওয়ার পরামর্শও ছিল। সম্পৃক্ত চর্বির উৎস হিসেবে সেখানে নারকেল তেল, ক্রিম, মাখন ও ঘিয়ের নাম আছে, আর বলা হয়েছে সূর্যমুখী, সয়াবিন, ক্যানোলা ও জলপাই তেলের মতো অসম্পৃক্ত চর্বি তুলনামূলক ভালো।

রেসিপিতে লবণ স্বাদমতো দিতে বলা হয়েছে এবং তা দেওয়া হয় শেষে, তাই পরিমাণ কম রাখা সহজ। উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা হৃদরোগের মতো কারণে যাঁদের চিকিৎসক বিশেষ খাদ্যতালিকা দিয়েছেন, এমন পদ তাঁদের খাদ্যতালিকায় কীভাবে মানাবে, তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।

২০০৬ সালে প্রকাশিত এবং ৮৭টির বেশি ভাষায় অনূদিত ডব্লিউএইচওর 'নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি' নিরাপদ রান্নাকে পাঁচটি বার্তায় তুলে ধরে: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা; ভালোভাবে রান্না করা; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা। এই রেসিপির ক্ষেত্রে এর মানে, রেসিপির প্রথম ধাপে যেমন বলা আছে, ফুলকপির টুকরো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নেওয়া, আর রেসিপির নিজের পরামর্শমতো কোরমা গরম গরম পরিবেশন করা।

ছবি: Nithyascorner / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (ইয়ারবুক অব এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৪), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (কৃষি প্রযুক্তি হাতবই, বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবার মাধ্যমে), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ, ২০১৩), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)