সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

শবে বরাতের মিষ্টান্ন: গাজর, সুজি ও দুধে তৈরি গাজরের রসমালাই

২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, শবে বরাতের দিন, জাগো নিউজ ২৪ গাজরের রসমালাইয়ের রেসিপি প্রকাশ করে: সেদ্ধ গাজর, ঘি, সুজি ও গুঁড়াদুধের বল মিষ্টি দুধে বাদামকুচি দিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়।

শবে বরাতের মিষ্টান্ন: গাজর, সুজি ও দুধে তৈরি গাজরের রসমালাই
রান্নাবান্না

শবে বরাতের দিন, ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে জাগো নিউজ ২৪ গাজরের রসমালাইয়ের একটি রেসিপি প্রকাশ করে; সেদিন রাতেই বাংলাদেশের মুসলিমদের শবে বরাত পালনের কথা ছিল। রসমালাই মানে মিষ্টি দুধে ভেজানো নরম বল; এই পদে সেই ধারণাই নেওয়া হয়েছে, তবে বলগুলো বানানো হয় চিরাচরিত ছানার বদলে সেদ্ধ করে ব্লেন্ড করা গাজর, ঘি, সুজি ও গুঁড়াদুধ দিয়ে। ছানা হলো দুধ ছিন্ন করে পাওয়া তাজা পনির। গাজর এই মিষ্টান্নকে দেয় স্বাভাবিক কমলা রং ও হালকা সুবাস, আর এর সব উপকরণই ঘরে সহজে পাওয়া যায়: গাজর, সুজি, তরল দুধ, গুঁড়াদুধ, চিনি, বাদামকুচি, এক চিমটি জাফরান ও এক চামচ ঘি। পত্রিকাটি পদটিকে চেনা রসমালাইয়ের একটি ভিন্ন রূপ হিসেবে উৎসবের আয়োজন বা অতিথি আপ্যায়নের জন্য তুলে ধরে।

উপকরণ


জাগো নিউজ ২৪ রেসিপিতে নিচের পরিমাণগুলো দিয়েছে। এই পরিমাণে কতজনের জন্য রসমালাই হবে, তা রেসিপিতে বলা নেই।

  • গাজর: ৪টি
  • সুজি: আধা কাপ
  • তরল দুধ: আধা কেজি
  • গুঁড়াদুধ: ১ কাপ
  • চিনি: আধা কাপ, বা স্বাদমতো
  • বাদামকুচি: ৩ টেবিল চামচ
  • জাফরান: ১ চিমটি
  • ঘি: ১ টেবিল চামচ

উপকরণের তালিকায় এক চিমটি জাফরান আছে, কিন্তু প্রস্তুত প্রণালীতে কোন ধাপে তা দিতে হবে, সেটি বলা নেই। এক কাপ গুঁড়াদুধের মধ্যে আধা কাপ যায় গাজরের মিশ্রণে; তরল দুধেও গুঁড়াদুধ মেশাতে বলা হয়েছে, তবে সেই দ্বিতীয় পরিমাণটি দেওয়া নেই।

ধাপে ধাপে তৈরির পদ্ধতি


পদ্ধতির দুটি অংশ পাশাপাশি চালানো যায়: গাজরের বল তৈরি, আর যে দুধে বলগুলো শেষ পর্যন্ত রান্না হয় সেই দুধ তৈরি।

  • গাজর ধুয়ে কুচি করে কেটে সেদ্ধ করুন।
  • ঠান্ডা হলে ব্লেন্ড করে নিন, আর ব্লেন্ড করা গাজরের কিছুটা আলাদা বাটিতে তুলে রাখুন।
  • প্যানে ঘি গরম করে বাকি ব্লেন্ড করা গাজর দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়ুন।
  • এতে সুজি ও আধা কাপ গুঁড়াদুধ দিয়ে অনবরত নাড়তে থাকুন।
  • মিশ্রণ হালুয়ার মতো আঠালো হয়ে এলে চুলা থেকে নামিয়ে নিন।
  • হাত দিয়ে মিষ্টির মতো ছোট ছোট গোল বল বানিয়ে কয়েক মিনিট ভাপ দিন।
  • এর মধ্যে তরল দুধে গুঁড়াদুধ ও চিনি মিশিয়ে জ্বাল দিন।
  • দুধ ফুটে উঠলে আলাদা করে রাখা গাজরের পেস্ট ও বাদামকুচি দিন।
  • এবার গাজরের বলগুলো দুধে দিয়ে ১০ মিনিট জ্বাল দিন।
  • ঠান্ডা হলে ওপরে বাদামকুচি ছড়িয়ে পছন্দের বাটিতে পরিবেশন করুন।

চিরাচরিত রসমালাইয়ে বল তৈরি হয় ছানা দিয়ে, আর দুধে দেওয়ার আগে সেগুলো প্রথমে চিনির সিরায় রান্না করা হয়। এখানে বলগুলো আসে গাজর ও সুজির হালুয়ার মতো মণ্ড থেকে, আর সিরার বদলে ভাপে রান্না হয়; আলাদা করে রাখা গাজরের পেস্ট দুধকেও রং ও স্বাদ দেয়।

শবে বরাতের রাতের মিষ্টান্ন


রেসিপিটি প্রকাশিত হয় শবে বরাতের দিনেই। বাংলা ট্রিবিউন ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জানায়, সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকার বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় দেখা যায়, দেশের কোথাও শাবান মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে রজব মাস ৩০ দিন পূর্ণ হবে, বুধবার ২১ জানুয়ারি থেকে শাবান মাস গণনা শুরু হবে এবং মঙ্গলবার ৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে সারাদেশে পবিত্র শবে বরাত পালিত হবে।

বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া শবে বরাতকে হিজরি সনের ১৫ শাবানের রাত হিসেবে বর্ণনা করে। মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, এই রাতে মানুষের আগামী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হয়, আর যে ব্যক্তি সারা রাত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে ক্ষমা চান, তিনি ক্ষমা পাওয়ার আশা করতে পারেন। অনেকে মসজিদে গিয়ে নামাজ ও ধ্যানে রাত কাটান, কেউ কেউ দিনে রোজা রাখেন; বাংলাপিডিয়া উল্লেখ করেছে, এই রোজা ঐচ্ছিক।

রাতটির খাবারের রীতিও আছে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, পরিবারগুলো রুটি ও নানা রকম মিষ্টান্ন তৈরি করে প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়, আর মোমবাতি বা বৈদ্যুতিক আলোয় ঘরবাড়ি ও রাস্তা আলোকিত করা হয়। জাগো নিউজ ২৪ এই উপলক্ষে যে কয়েকটি মিষ্টির রেসিপি প্রকাশ করে, গাজরের রসমালাই তার একটি। রেসিপির পাতায় সংযুক্ত ছিল পাকা পেঁপের হালুয়া, লাউয়ের হালুয়া ও সুজির হালুয়ার রেসিপি, যেগুলো শবে বরাতের আয়োজনের জন্য দেওয়া হয়; সঙ্গে ছিল বিটরুট হালুয়া ও খেজুরের হালুয়ার রেসিপি।

বাংলাদেশে তৈরি পেঁপে, গাজর ও সুজির হালুয়া, নিচে বুটের হালুয়া। ছবি: মোহাম্মদ তাওসিফ সালাম / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
বাংলাদেশে তৈরি পেঁপে, গাজর ও সুজির হালুয়া, নিচে বুটের হালুয়া। ছবি: মোহাম্মদ তাওসিফ সালাম / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)

রসমালাই কী


রসমালাই, যাকে রোশমালাইও বলা হয়, উপমহাদেশের বঙ্গ অঞ্চলে উদ্ভূত একটি মিষ্টান্ন, যা বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে জনপ্রিয়। নামটি দুটি শব্দ মিলে তৈরি: রস, অর্থাৎ নির্যাস, আর মালাই, অর্থাৎ সর বা ক্রিম। চিরাচরিত পদ্ধতিতে দুধ ফুটিয়ে সামান্য লেবুর রস দিয়ে ছিন্ন করা হয়, ছেঁকে ছানার পানি ফেলে দেওয়া হয়, তারপর ঝরানো ছানা মথে মণ্ড বানিয়ে ছোট ছোট বল করা হয়। বলগুলো চিনির সিরায় রান্না করে মিষ্টি ও সুগন্ধি দুধে ভিজিয়ে রাখা হয়। রসমালাই ঠান্ডা পরিবেশন করা হয়, আর এর প্রচলিত সুগন্ধি উপকরণের মধ্যে আছে জাফরান, এলাচ, পেস্তাবাদাম ও গোলাপজল।

বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, রসমালাই এক ধরনের রসগোল্লা, তবে এর ছানার বলগুলো আকারে ছোট এবং গোলের বদলে লম্বাটে, আর সেগুলো সিরার বদলে ঘন দুধে ভাসে। জ্ঞানকোষটি জানায়, ঢাকা ও রংপুরেও রসমালাই তৈরি হয়, যেখানে বলগুলো গোল; আর কুমিল্লার নাম আসে দুটি মিষ্টির জন্য: ঘন দুধ ও চিনিতে তৈরি প্যাড়া এবং রসমালাই। বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে, বাঙালির মিষ্টান্ন মূলত ছিন্ন দুধ থেকে তৈরি, আর মধ্যযুগে দুধ ছিন্ন করার পদ্ধতি আবিষ্কার বাঙালির মিষ্টির সংস্কৃতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।

রসমালাই প্রথম কোথায় তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। উইকিপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৩০ সালে সেন ভাইয়েরা কুমিল্লায় মাতৃ ভাণ্ডার নামের দোকান খোলার পর মিষ্টিটি জনপ্রিয় হয়, আর সেন পরিবার দাবি করে, তারাই প্রথম এটি তৈরি করেছিল। কলকাতার কে. সি. দাশ পরিবার এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত করে এবং ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারির একটি বাংলা বিজ্ঞাপনের কথা বলে, যেখানে মিষ্টিটিকে তাদের উদ্ভাবন বলে দাবি করা হয়েছিল।

রসমালাই, মিষ্টান্নটির একটি সাধারণ ছবি। ছবি: Miansari66 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)
রসমালাই, মিষ্টান্নটির একটি সাধারণ ছবি। ছবি: Miansari66 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)

কুমিল্লার রসমালাই ও ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি


কুমিল্লার রসমালাই বাংলাদেশে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে; জিআই এমন একটি স্বীকৃতি, যা কোনো পণ্যের নামকে সেই স্থানের সঙ্গে যুক্ত করে, যে স্থান পণ্যটিকে তার বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। এর প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৭ সালে, যখন কুমিল্লা জেলা প্রশাসন নিবন্ধনের জন্য স্থানীয় পণ্য বাছাই করে। মেধাস্বত্ব বিষয়ক প্রতিষ্ঠান খুরানা অ্যান্ড খুরানা ২০১৭ সালের মে মাসে জানায়, পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) একজন কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, জেলা থেকে পণ্যগুলো পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে নিবন্ধন দেওয়া হবে।

প্রথম আলো ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি জানায়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিপিডিটি আরও চারটি পণ্যের জিআই স্বীকৃতি নিশ্চিত করেছে: টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা এবং ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল। রসমালাইয়ের আবেদন করেছিল জেলা প্রশাসন। স্বীকৃতির আগে আবেদন জার্নালে প্রকাশ করা হয় এবং আপত্তি জানানোর জন্য দুই মাস সময় থাকে; এই চার পণ্যের বিষয়ে কোনো আপত্তি আসেনি, আর এগুলো নিয়ে সে বছর জিআই স্বীকৃতির সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টিতে।

জিআই স্বীকৃতি কুমিল্লার পণ্যটির। গাজরের এই রসমালাইয়ের মতো ঘরোয়া রেসিপি কেবল রসমালাইয়ের ধরনটি গ্রহণ করে: মিষ্টি দুধে রান্না করা বল, যা ঠান্ডা করে পরিবেশন করা হয়।

উপমহাদেশের মিষ্টান্নে গাজর


গাজরের রসমালাইয়ের অনেক আগে থেকেই এ অঞ্চলের মিষ্টান্নে গাজরের জায়গা ছিল। সবচেয়ে পরিচিত গাজরের হালুয়া, হিন্দি-উর্দুতে গাজর কা হালওয়া। এটি এক ধরনের গাজরের পুডিং, যার প্রধান উপকরণ সদ্য কোরানো গাজর, দুধ, চিনি, এলাচ, খোয়া ও ঘি। ঘিয়ে নিয়মিত নেড়ে নেড়ে রান্না করা হয়, আর প্রায়ই কাঠবাদাম ও পেস্তাবাদাম দিয়ে সাজানো হয়। শীতকালে সাধারণত গরম পরিবেশন করা হয় এবং ঈদসহ উপমহাদেশের নানা উৎসবে খাওয়া হয়; এটি ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রান্নার অংশ। শুরুতে এই হালুয়ায় থাকত কেবল গাজর, দুধ ও ঘি; মাওয়ার মতো উপকরণ যোগ হয়েছে পরে।

গাজরের রসমালাই এই দুই ধারাকে মিলিয়েছে। এর বল শুরু হয় অনেকটা গাজরের হালুয়ার মতো, ঘিয়ে নাড়তে নাড়তে মিশ্রণ আঠালো হওয়া পর্যন্ত; আর শেষ হয় রসমালাইয়ের মতো, মিষ্টি দুধে জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করে বাদামকুচিসহ পরিবেশনে।

গাজর: দীর্ঘ ইতিহাসের একটি মূল


গাজর (Daucus carota subsp. sativus) অ্যাপিয়েসি গোত্রের একটি মূলজাতীয় সবজি। প্রজাতিটি দ্বিবর্ষজীবী, অর্থাৎ এর জীবনচক্র সম্পূর্ণ হতে দুই বছর লাগে; এর স্ফীত মূলটিই তোলা হয় এবং খাওয়া হয়।

গৃহপালিত গাজরের উৎপত্তি সম্ভবত ইরানে, যেখানে শুরুতে এর পাতা ও বীজের জন্য চাষ হতো; আধুনিক গাজর এসেছে আফগানিস্তান থেকে, মোটামুটি দশম শতকে। সেই প্রাচীন পূর্বদেশীয় গাজর ছিল বেশির ভাগ বেগুনি বা হলুদ, আর সেগুলোর যে নমুনা আজও টিকে আছে, সেগুলোও সাধারণত এই রঙেরই। কমলা গাজর তৈরি করেছিলেন ডাচ চাষিরা: ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকে নেদারল্যান্ডসে কমলা রঙের পশ্চিমা গাজরের আবির্ভাব ঘটে। গাজরের কমলা রঙের উৎস ক্যারোটিন। কাঁচা গাজরের প্রায় ৮৮ শতাংশ পানি, ১০ শতাংশ শর্করা ও ১ শতাংশ আমিষ; চর্বির পরিমাণ নগণ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি গবেষণা সংস্থার (এআরএস) বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত নানা রঙের গাজর। ছবি: স্টিফেন অসমাস, ইউএসডিএ এআরএস / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি গবেষণা সংস্থার (এআরএস) বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত নানা রঙের গাজর। ছবি: স্টিফেন অসমাস, ইউএসডিএ এআরএস / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

একটি গাজরে কী থাকে


যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডার (এসআর লিগ্যাসি, ২০১৯) অনুযায়ী ১০০ গ্রাম কাঁচা গাজরে থাকে:

  • পানি: ৮৮.২৯ গ্রাম
  • শক্তি: ৪১ কিলোক্যালরি
  • শর্করা: ৯.৫৮ গ্রাম, যার মধ্যে মোট চিনি ৪.৭৪ গ্রাম
  • খাদ্যআঁশ: ২.৮ গ্রাম
  • আমিষ: ০.৯৩ গ্রাম; চর্বি: ০.২৪ গ্রাম
  • ভিটামিন এ: ৮৩৫ মাইক্রোগ্রাম রেটিনল অ্যাক্টিভিটি ইকুইভ্যালেন্ট
  • বিটা-ক্যারোটিন: ৮,২৮৫ মাইক্রোগ্রাম; আলফা-ক্যারোটিন: ৩,৪৭৭ মাইক্রোগ্রাম
  • পটাশিয়াম: ৩২০ মিলিগ্রাম; ক্যালসিয়াম: ৩৩ মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন সি: ৫.৯ মিলিগ্রাম; ভিটামিন কে: ১৩.২ মাইক্রোগ্রাম

এই হিসাব কাঁচা গাজরের। এই রেসিপিতে গাজর সেদ্ধ ও ব্লেন্ড করে ঘি, দুধ, গুঁড়াদুধ ও চিনির সঙ্গে রান্না করা হয়, তাই এক বাটি রসমালাই আর কাঁচা গাজর এক খাবার নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যতথ্য সেবা মেডলাইনপ্লাস তাদের ভিটামিন এ বিষয়ক পাতায় (২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পর্যালোচিত) ব্যাখ্যা করেছে, বিটা-ক্যারোটিন উদ্ভিদজাত একটি যৌগ, যা খাওয়ার পর শরীর ভিটামিন এ-তে রূপান্তর করে; যে কমলা ও হলুদ সবজি ও ফল এর জোগান দেয়, তার তালিকায় গাজর আছে। মেডলাইনপ্লাসের ভাষায়, ভিটামিন এ সুস্থ দাঁত, অস্থি ও নরম কলা, শ্লেষ্মাঝিল্লি ও ত্বক গঠন ও রক্ষায় সাহায্য করে এবং ভালো দৃষ্টিশক্তিতে, বিশেষ করে কম আলোয় দেখায়, ভূমিকা রাখে।

তবে পদটি নিজে একটি মিষ্টান্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যকর খাদ্য বিষয়ক তথ্যপত্র, ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারির সংস্করণে, ফ্রি সুগার, অর্থাৎ খাবার ও পানীয়তে যোগ করা চিনি, দৈনিক মোট শক্তি গ্রহণের ১০ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শ দিয়েছে; দিনে প্রায় ২,০০০ ক্যালরি গ্রহণকারী স্বাভাবিক ওজনের একজন মানুষের জন্য তা প্রায় ৫০ গ্রাম বা ১২ সমান চা-চামচ। সংস্থাটি বলেছে, তা ৫ শতাংশ বা তার কমে নামালে বাড়তি স্বাস্থ্য-উপকার মিলতে পারে। একই তথ্যপত্রে ১০ বছরের বেশি বয়সী সবাইকে দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ডায়াবেটিস আছে বা বিশেষ খাদ্যতালিকা মেনে চলেন, এমন কেউ এ ধরনের মিষ্টি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বাংলাদেশে গাজর চাষ


বাংলাদেশে গাজর শীতকালীন বা রবি মৌসুমের সবজি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৪-এ গাজরের বপনকাল সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য-ডিসেম্বর এবং সংগ্রহকাল ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি উল্লেখ করেছে; প্রতি একরে বীজ লাগে প্রায় ১,০৫০ গ্রাম। ফেব্রুয়ারির শুরুতে, যখন রেসিপিটি প্রকাশিত হয়, বাজারের গাজর আসছিল সেই শীতের ফসল থেকে।

একই বর্ষগ্রন্থের হিসাবে ২০২৩-২৪ সালে গাজর চাষ হয়েছে ৭ হাজার একরে, গড় ফলন একরপ্রতি ৬,৩২৭.৯০ কেজি, আর উৎপাদন ৪৩ হাজার টন। ২০২২-২৩ সালে আবাদ ছিল ৬ হাজার একরে, উৎপাদন ৩৫ হাজার টন; ২০২১-২২ সালে ৬ হাজার একরে উৎপাদন হয় ৩১ হাজার টন। দেশের প্রধান শীতকালীন সবজির পাশে গাজর ছোট একটি ফসল: একই সারণিতে ২০২৩-২৪ সালে সব মিলিয়ে শীতকালীন সবজি উৎপাদিত হয়েছে ৭৭০ হাজার একরে ৩,৯৫৪ হাজার টন।

বর্ষগ্রন্থের ২০২২-২৩ সালের জেলাভিত্তিক সারণি দেখায়, গাজর চাষ কতটা কয়েকটি এলাকায় কেন্দ্রীভূত। দেশে মোট ৬,৪৮৮.৫৬ একরে ৩৫,২৭০.৬১ টন গাজরের মধ্যে কেবল মানিকগঞ্জেই চাষ হয়েছে ১,৭২৯.৯৮ একরে, উৎপাদন ১৪,০৫৭.৫০ টন। এরপর পাবনা, ৫০৭ একরে ৪,১২৩.৮২ টন; তারপর ঢাকা জেলা, ৩৮৩.৪৯ একরে ২,৯৩৬.৬১ টন; জামালপুর, ২৮৭ একরে ১,২১৭ টন; এবং বগুড়া, ১৬৫.৩৭ একরে ১,০০৭.৫৩ টন। বরিশাল, গোপালগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও হবিগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় কোনো গাজর চাষের হিসাবই নেই।

মানিকগঞ্জের সিংগাইর


মানিকগঞ্জের মধ্যে সিংগাইর উপজেলা গাজরের জন্য পরিচিত। ঢাকা ট্রিবিউন ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জানায়, সিংগাইরের ৩০টি গ্রামের প্রায় ১,২০০ হেক্টর জমিতে গাজর চাষ হয়েছে, হেক্টরপ্রতি প্রত্যাশিত ফলন ১৮ থেকে ২০ টন। কৃষকেরা তখন কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকায় গাজর বিক্রি করছিলেন, আর বিঘাপ্রতি চাষে খরচ করছিলেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। কর্মকর্তারা জানান, দেশে উচ্চফলনশীল গাজরের বীজ পাওয়া যায় না, তাই কৃষকেরা জাপান থেকে অরেঞ্জ কিং জাতের বীজ আমদানি করেন; কয়েকজন কৃষক বীজের দাম কমাতে সরকারের কাছে দাবি জানান। মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, কৃষকেরা বীজ, সার ও কীটনাশক বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ পান, আর বপনের প্রায় তিন মাস পর গাজর বিক্রির উপযোগী হয়। এক স্থানীয় পাইকার জানান, তিনি সিংগাইরের গাজর ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও বরিশালে পাঠান।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জানায়, সিংগাইর উপজেলা কৃষি অফিস সেই মৌসুমে ১,০৭১ হেক্টর জমি থেকে ৪৩,০০০ টন উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছিল; ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১,১১৭ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছিল ৪২,৭২৫ টন, আর বন্যার কারণে আবাদি জমি ৪৬ হেক্টর কমে যায়। আশ্বিন-কার্তিকে বপন শুরু হয়, প্রায় ৯০ দিনে গাজর বিক্রির উপযোগী হয়, আর সেখানকার মাটি বেশির ভাগ বেলে দোআঁশ। এক বিঘায় চাষের খরচ ছিল ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা; স্বাভাবিক ফলন ১৫০ থেকে ১৬০ মণ, ভালো ফলনে ২২০ থেকে ২৩০ মণ পর্যন্ত; কৃষিশ্রমিকেরা দিনে পেতেন ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। কৃষকেরা জানান, ঢাকার পাইকারেরাই সবচেয়ে বড় ক্রেতা।

ডিএইর স্থানীয় হিসাব আর বিবিএসের বর্ষগ্রন্থের হিসাবে বড় ফারাক রয়েছে, দুটি সরাসরি তুলনীয় নয়; এখানে প্রতিটি হিসাব তার উৎস যেভাবে প্রকাশ করেছে, সেভাবেই দেওয়া হলো।

বাংলাদেশের একটি সবজির দোকানে সবুজ বেগুন, আলু ও গাজর। ছবি: Sm faysal / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
বাংলাদেশের একটি সবজির দোকানে সবুজ বেগুন, আলু ও গাজর। ছবি: Sm faysal / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

দুধ ও অন্যান্য উপকরণ


যেকোনো রসমালাইয়ের ভিত্তি দুধ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) প্রকাশনা লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২৫, যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিবিএসের তথ্য থেকে প্রস্তুত এবং সাময়িক হিসাব হিসেবে চিহ্নিত, অনুযায়ী ২০২৪-২৫ সালে দেশে দুধ উৎপাদন হয়েছে ১৫৫.৩৮ লাখ টন, যা ২০২৩-২৪ সালে ছিল ১৫০.৪৪ লাখ টন। জনপ্রতি দিনে ২৫০ মিলিলিটার ধরে চাহিদা ১৬২.৩৩ লাখ টন, আর প্রাপ্যতা জনপ্রতি দিনে ২৩৯.২৯ মিলিলিটার।

একই প্রকাশনায় ২০২৪-২৫ সালে দেশে গরুর সংখ্যা ২৫১.৭১ লাখ, স্থিরমূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদ খাতের অংশ ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে অংশ ১৬.৫৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘরের রান্নাঘরের তরল দুধ ও গুঁড়াদুধ এই বড় শৃঙ্খলেরই শেষ প্রান্ত।

সুজি, ঘি ও জাফরান


সুজি হলো মোটা দানার আটা, যা প্রথাগতভাবে ডুরুম গম থেকে তৈরি হয়। উপমহাদেশে সাধারণ গমের সুজি মোটা বা মিহি করে ভাঙানো হয়, একে সুজি বা রাভা বলা হয়, আর হালুয়ার মতো মিষ্টান্নে এটি ব্যবহৃত হয়। এই রেসিপিতে ব্লেন্ড করা গাজর ও গুঁড়াদুধের সঙ্গে সুজি রান্না করা হয়, যতক্ষণ না মিশ্রণ বল বানানোর মতো শক্ত হয়।

ঘি, অর্থাৎ পরিশোধিত মাখন, সেই চর্বি, যাতে ব্লেন্ড করা গাজর প্রথমে নাড়া হয়, ঠিক যেমন গাজরের হালুয়ায়।

জাফরান হলো শরৎকালে ফোটা জাফরান ক্রোকাস (Crocus sativus) ফুলের শুকানো লাল গর্ভমুণ্ড। হাতে সংগ্রহ করতে হয় বলে এটি দামি: এক কেজি জাফরানের জন্য প্রায় দেড় লাখ ফুল থেকে হাতে তোলা প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার গর্ভমুণ্ড লাগে। ক্রোসিন নামের একটি ক্যারোটিনয়েড রঞ্জক জাফরানকে সোনালি-হলুদ রং দেয়, পিক্রোক্রোসিন দেয় স্বাদ, আর সাফরানাল দেয় এর সুবাসের বড় অংশ। জাফরানের সবচেয়ে বড় উৎপাদক ইরান।

ছবি: Shreya13jain / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, প্রথম আলো, খুরানা অ্যান্ড খুরানা, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৪), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, মেডলাইনপ্লাস (যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)