২০২৬ সালের ২৭ মার্চ, শুক্রবার, বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক ঝটপট ডিম পোলাওয়ের একটি রেসিপি প্রকাশ করে। লেখাটি ছিল তাঁদের জন্য, যাঁদের ছুটির দিন কাটে ঘর-বাড়ি গোছানো, সারা সপ্তাহের জামা-কাপড় পরিষ্কার করা আর অন্যান্য কাজে, এবং যাঁরা সবসময় রান্নার সময় বা সুযোগ পান না। পদটিতে মেলানো হয়েছে পোলাওয়ের চাল, হলুদ ও লবণ মাখিয়ে সোনালি করে ভাজা সেদ্ধ ডিম, পেঁয়াজ, টমেটো, আদা ও রসুনের মসলা, দুধ, ঘি আর গোটা মসলা; শেষে কম আঁচে ১০ থেকে ১৫ মিনিট দমে রাখা হয়। পত্রিকাটির ভাষায়, এটি সহজে তৈরি করা যায় এবং স্বাদে সবাইকে মুগ্ধ করবে।
এই প্রতিবেদনে রেসিপিটি হুবহু জাগো নিউজের প্রকাশিত রূপেই দেওয়া হলো। সঙ্গে যোগ করা হলো দেশি ও আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের তথ্য: পোলাও কী এবং শব্দটি কোথা থেকে এসেছে, যে সুগন্ধি চালে এটি রান্না হয়, বাংলাদেশে ডিমের উৎপাদন, হাঁড়ির মসলা ও সুগন্ধি উপকরণ, জাতীয় খাদ্য উপাদান সারণিতে কাছাকাছি খাবারগুলোর পুষ্টিমান, আর ডিম ও বেঁচে যাওয়া খাবার নিরাপদে রাখার বিষয়ে খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থার পরামর্শ।
জাগো নিউজে প্রকাশিত রেসিপি
মূল লেখায় উনিশটি উপকরণ আছে। নিচের পরিমাণগুলো পত্রিকার নিজের দেওয়া। কাপ ও চামচ ঘরোয়া মাপ, ওজন নয়; আর রেসিপিতে কয়জনের জন্য রান্না, তা বলা নেই।
- পোলাওয়ের চাল: ২ কাপ
- সেদ্ধ ডিম: ৫টি
- টমেটো কুচি: ১ কাপ
- পেঁয়াজ কুচি: ১ কাপ
- কাঁচা মরিচ: ৫টি
- লাল মরিচের গুঁড়া: ১ চা চামচ
- জিরার গুঁড়া: ১ চা চামচ
- আদা বাটা: ১ টেবিল চামচ
- রসুন বাটা: ১ টেবিল চামচ
- এলাচ: ৪ ও ৫টি
- দারুচিনি: ২টি
- তেজপাতা: ৩টি
- জয়ফল গুঁড়া: আধা চা চামচ
- দুধ: ২ কাপ
- ঘি: ২ টেবিল চামচ
- তেল: ২ চা চামচ
- বেরেস্তা: ২ টেবিল চামচ
- পানি: পরিমাণমতো
- লবণ ও চিনি: স্বাদমতো
প্রস্তুত প্রণালি
- প্রথমে চুলায় একটি প্যানে তেল গরম করুন।
- সেদ্ধ ডিমগুলো অল্প হলুদ ও লবণ দিয়ে মাখিয়ে সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন।
- ওই তেলেই তেজপাতা, এলাচ ও দারুচিনি দিয়ে পেঁয়াজ কুচি ভাজুন।
- পেঁয়াজ হালকা বাদামি হলে আদা বাটা, রসুন বাটা, টমেটো কুচি, লবণ এবং সব গুঁড়া মসলা দিয়ে ভালো করে কষান।
- এরপর চাল দিয়ে কিছুক্ষণ ভাজুন।
- দুধ ও ফুটন্ত গরম পানি দিন।
- পানি ফুটে চালের সঙ্গে মিশে গেলে সেদ্ধ ডিমগুলো দিয়ে দিন।
- কেওড়া জল ছড়িয়ে ঢাকনা দিয়ে কম আঁচে ১০ থেকে ১৫ মিনিট দমে রাখুন।
- হয়ে গেলে বেরেস্তা ও ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। সুন্দরভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।
রান্নার আগে মূল লেখার তিনটি বিষয় জেনে রাখা ভালো। প্রণালিতে অল্প হলুদ ও কেওড়া জল ব্যবহারের কথা আছে, কিন্তু উপকরণের তালিকায় এ দুটির উল্লেখ নেই, পরিমাণও দেওয়া হয়নি। তালিকায় পাঁচটি কাঁচা মরিচ আছে, কিন্তু কখন সেগুলো দিতে হবে, প্রণালিতে তা বলা নেই। আর পানির পরিমাণ রাখা হয়েছে 'পরিমাণমতো': দুই কাপ চালের জন্য দুই কাপ দুধের কথা আছে, তবে মোট তরলের পরিমাণ বলা হয়নি। এগুলো পত্রিকার নিজের নির্দেশনা, এখানে কিছু যোগ না করে যেমন ছিল তেমনই দেওয়া হলো।
পোলাও কী
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া তার ধান বিষয়ক ভুক্তিতে প্রথমে রোজকার শব্দগুলো বুঝিয়ে দেয়: ধানের খোসা ছাড়ালে হয় চাল, আর চাল রান্না করলে ভাত। এরপর বলা হয়েছে, পোলাও, মোরগ-পোলাও, বিরিয়ানি, তেহারি ইত্যাদি সুগন্ধি ছোট দানার চালের বিশেষ পদ, যা মুরগি, গরু বা খাসির মাংস, ঘি ও মসলা দিয়ে রান্না হয়; আর ডালের সঙ্গে চাল মিশিয়ে রান্না করলে হয় খিচুড়ি।
শব্দটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। তথ্যসূত্রে উদ্ধৃত অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ইংরেজি 'পিলাউ' শব্দটি প্রথম লিখিত পাওয়া যায় ১৬০৯ সালে; এটি এসেছে ফারসি 'পুলাও' থেকে, যা এসেছে হিন্দি 'পুলাও' থেকে, অর্থাৎ চাল ও মাংসের একটি পদ, আর সেটির মূল সংস্কৃত 'পুলাক', অর্থাৎ ভাতের দলা। খাদ্য-ইতিহাসবিদেরা চাল রান্নার এই পদ্ধতির বিস্তারকে আব্বাসীয় খিলাফতের সময়ের সঙ্গে যুক্ত করেন, যখন এটি দক্ষিণ এশিয়া থেকে স্পেন পর্যন্ত বিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে; তুরস্কের পিলাভ, ইরানের পোলো এবং স্পেনের পায়েইয়া একই পরিবারের পদ।
বাংলাদেশে পোলাওকে উৎসব-অনুষ্ঠানের পদ হিসেবে দেখা হয় এবং এটি সুগন্ধি চালে রান্না হয়। তথ্যসূত্রগুলোর বর্ণনায় সাধারণ পদ্ধতি হলো: চাল প্রথমে তেল বা ঘিতে পেঁয়াজ, আদা এবং এলাচ, দারুচিনি ও গোলমরিচের মতো গোটা সুগন্ধি মসলার সঙ্গে ভাজা হয়, তারপর মাংসের ঝোল বা পানিতে রান্না করা হয়, প্রথমে ফুটিয়ে, পরে দমে। শেষে আরও একটু ঘি এবং গোলাপজল বা কেওড়া জলের মতো সুগন্ধি দেওয়া হয়, আর পরিবেশনের সময় ওপরে ছড়ানো হয় ভাজা পেঁয়াজ, যাকে বলে বেরেস্তা।
জাগো নিউজের ডিম পোলাও এই ধারাই প্রায় হুবহু মেনে চলে: তেলে গোটা মসলা ও পেঁয়াজ ভাজা, তরল দেওয়ার আগে চাল ভেজে নেওয়া, ঢাকনা দিয়ে কম আঁচে দমে রাখা, আর শেষে ঘি, বেরেস্তা ও কেওড়া জল। এর বাড়তি সংযোজন হলো আগে ভেজে তুলে রাখা ডিম, যা পরে হাঁড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, গুঁড়া মসলা দিয়ে কষানো টমেটোর মসলা, আর রান্নার তরলের একটি অংশ হিসেবে দুধ।
বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্য উপাদান সারণিতে একটি সাধারণ পোলাওয়ের রেসিপি আছে, যা থেকে সহজ রূপে উপকরণের অনুপাত বোঝা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (আইএনএফএস) ২০১৩ সালের জুনে খাদ্য মন্ত্রণালয়, এফএও ও ইউএসএআইডির সহায়তায় 'ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ' প্রকাশ করে। সেখানে তিনজনের জন্য ১৫০ গ্রাম আতপ চাল, ৫ গ্রাম পেঁয়াজ, ১০ গ্রাম সয়াবিন তেল, এলাচ, দারুচিনি ও তেজপাতা মিলিয়ে ২ গ্রাম, ১ গ্রাম আদা-রসুন বাটা, ২ গ্রাম লবণ এবং ৩৪৫ গ্রাম পানির কথা বলা হয়েছে। চাল ভালো করে ধুয়ে তেল ও মসলার সঙ্গে প্রায় পাঁচ মিনিট ভাজা হয়, তারপর গরম পানি দিয়ে ঢেকে রাখা হয় যতক্ষণ না রান্না হয়।

চাল: বাংলাদেশের সুগন্ধি জাত
রেসিপির 'পোলাওয়ের চাল' হলো বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ছোট দানার সুগন্ধি চাল। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) জেনেটিক রিসোর্সেস অ্যান্ড সিড ডিভিশনের বিজ্ঞানীরা সিআইএটি হারভেস্টপ্লাস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীদের সঙ্গে ২০১৬ সালে 'দ্য সায়েন্টিফিক ওয়ার্ল্ড জার্নাল'-এ দেশের সুগন্ধি ও সরু চাল নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৮ হাজারের বেশি ধানের জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত আছে, যার প্রায় ১০০টি সুগন্ধি। সুগন্ধি জাতসহ স্থানীয় জাতগুলো দেশের ধান চাষের জমির প্রায় ১২.১৬ শতাংশ জুড়ে ছিল। লেখকেরা লিখেছেন, সুগন্ধি চাল বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, বিয়ে ও অন্যান্য উৎসবে তা খাওয়া হয়; আর দেশি সুগন্ধি ও সরু জাতের দানা সাধারণত খাটো-মোটা বা মাঝারি-মোটা, সুগন্ধ হালকা থেকে তীব্র।
একই গবেষণায় প্রধান জাতগুলোর নাম আছে। চিনিগুঁড়া দেশের প্রধান সুগন্ধি ধান; উত্তরের নওগাঁ ও দিনাজপুর জেলার ধানের খামারের ৭০ শতাংশের বেশি জুড়ে এর চাষ। কালিজিরা মূলত ময়মনসিংহে, কাটারিভোগ মূলত দিনাজপুরে চাষ হয়। দেশের বেশির ভাগ সুগন্ধি জাত স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজিত ও আলোক-সংবেদনশীল, আমন মৌসুমে বৃষ্টিনির্ভর নিচু জমিতে চাষ হয়। এগুলোর উৎপাদন খরচ মোটা চালের চেয়ে কম, কারণ সাধারণত বাড়তি সার, কীটনাশক ও সেচের খরচ লাগে না; তবে ফলনও কম: হেক্টরে ২.০ থেকে ২.৩ টন, যেখানে বৃষ্টিনির্ভর নিচু জমির উচ্চফলনশীল ধানের গড় ফলন ৩.৪ টন। গবেষকেরা ব্রির জিনব্যাংক থেকে ১১৩টি সুগন্ধি ও সরু ধানের জিনোটাইপ পরীক্ষা করেন, যার মধ্যে ছিল ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮ ও ব্রি ধান৫০-এর মতো ব্রি উদ্ভাবিত জাত, আর কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, কাটারিভোগ, তুলসীমালা ও বাদশাভোগের মতো ঐতিহ্যবাহী জাত।
২০২১ সালে 'প্লস ওয়ান' সাময়িকীতে যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণা ঢাকার বাজারে চালের মান যাচাই করে। তাঁরা দেখেন, শহরজুড়ে নানা ধরনের চাল বিক্রি হয়, যার মধ্যে আছে দেশি চিনিগুঁড়া ও কালিজিরার মতো দামি সুগন্ধি চাল এবং আমদানি করা জেসমিন ও বাসমতী চাল। আগের গবেষণার বরাতে লেখকেরা লেখেন, বাংলাদেশে যত মানুষ সুগন্ধি চাল পছন্দ করেন, নিয়মিত খান তার চেয়ে কম মানুষ; সম্ভবত এর কারণ বেশি দাম এবং এটিকে বিশেষ খাবার হিসেবে দেখার প্রবণতা।
আইএনএফএসের খাদ্য উপাদান সারণিতে রোদে শুকানো কাঁচা সুগন্ধি চালের (আতপ, সুগন্ধি, চিকন দানা) পুষ্টিমান দেওয়া আছে। প্রতি ১০০ গ্রামে ৩৪৩ কিলোক্যালরি শক্তি, ১২.৮ গ্রাম পানি, ৬.৭ গ্রাম প্রোটিন, ০.৭ গ্রাম চর্বি, ৭৬.১ গ্রাম শর্করা এবং ৩.১ গ্রাম খাদ্যআঁশ। লবণ ছাড়া সেদ্ধ করলে একই চালের প্রতি ১০০ গ্রামে ১১০ কিলোক্যালরি, ৭২.০ গ্রাম পানি, ২.২ গ্রাম প্রোটিন এবং ২৪.৪ গ্রাম শর্করা থাকে। সারণিতে এই চাল সেদ্ধ করার ইল্ড ফ্যাক্টর ধরা হয়েছে ৩.১২, অর্থাৎ রান্না করা ভাতের ওজন কাঁচা চালের তিন গুণের কিছু বেশি হয়।

ডিম: বাংলাদেশের পোলট্রি উৎপাদন
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) তাদের 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৪-২৫'-এ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবের ভিত্তিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন দেখিয়েছে ২ হাজার ৪৪০.৬৫ কোটি। তাদের ধারাবাহিক হিসাবে উৎপাদন ২০১৫-১৬ সালের ১ হাজার ১৯১.২৪ কোটি থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ সালে ২ হাজার ৩৩৭.৬৩ কোটি এবং ২০২৩-২৪ সালে ২ হাজার ৩৭৪.৯৭ কোটিতে দাঁড়ায়। অধিদপ্তর চাহিদা ধরেছে ১ হাজার ৮৫০.১৬ কোটি ডিম, অর্থাৎ মাথাপিছু বছরে ১০৪টি; এর বিপরীতে প্রাপ্যতা দেখানো হয়েছে মাথাপিছু বছরে ১৩৭.১৯টি। একই প্রকাশনায় স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে প্রাণিসম্পদের সাময়িক অংশ ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬.৫৪ শতাংশ বলা হয়েছে।
বাংলাপিডিয়ার পোলট্রি ভুক্তি অনুযায়ী, গৃহপালিত মুরগির পূর্বপুরুষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাল বনমোরগ, আর সম্ভবত চার হাজার বছরেরও আগে এটি পোষ মানানো হয়। দেশি মুরগি তুলনামূলক কম ডিম ও মাংস দেয় বলে বাংলাদেশে খামারগুলো হোয়াইট লেগহর্ন, রোড আইল্যান্ড রেড ও প্লিমাউথ রকের মতো উন্নত জাতের দিকে ঝুঁকেছে। জ্ঞানকোষটি লিখেছে, এগুলোর মধ্যে হোয়াইট লেগহর্ন সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং এর মুরগি বছরে প্রায় ২৩০টি ডিম দিতে পারে; আর জনপ্রিয় হয়ে ওঠা কোয়েল বছরে ২০০টির বেশি ডিম দিতে পারে।
আইএনএফএসের সারণির ডিম অধ্যায় শুরু হয়েছে ডিমে কী থাকে তার বর্ণনা দিয়ে। মুরগির ডিম মানুষের প্রয়োজনীয় সব অত্যাবশ্যক অ্যামাইনো অ্যাসিড জোগায়, তাই একে পূর্ণাঙ্গ প্রোটিনের উৎস ধরা হয়; এতে আছে রেটিনল, রিবোফ্ল্যাভিন, ফোলেট, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২, কোলিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের মতো ভিটামিন ও খনিজ। কুসুম ডিমের তরল ওজনের প্রায় ৩৩ শতাংশ; সব চর্বি, প্রোটিনের অর্ধেকের সামান্য কম এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের বেশির ভাগ, ডিমের সব ভিটামিন এ, ডি ও ই কুসুমেই থাকে। সাদা অংশে প্রোটিন আছে, চর্বি প্রায় নেই।
লবণ ছাড়া সেদ্ধ ডিমের খাওয়ার উপযোগী অংশের প্রতি ১০০ গ্রামে সারণির হিসাব এমন। খামারের মুরগির ডিম: ১৫৮ কিলোক্যালরি, ৬৮.৫ গ্রাম পানি, ১৬.৫ গ্রাম প্রোটিন, ১০.২ গ্রাম চর্বি, ১.৮ মিলিগ্রাম আয়রন, ১৭৮ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ, ২.০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ডি এবং ৪৫ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট। দেশি মুরগির ডিম: ১৭৯ কিলোক্যালরি, ১৫.১ গ্রাম প্রোটিন ও ১৩.২ গ্রাম চর্বি। হাঁসের ডিম: ২১৪ কিলোক্যালরি, ১৫.৩ গ্রাম প্রোটিন ও ১৬.২ গ্রাম চর্বি। মুরগির ডিমের খাওয়ার উপযোগী অংশের সহগ ০.৮৭, অর্থাৎ বাকি ওজন খোসার। তুলনার জন্য, সারণির সাধারণ পোলাওয়ের প্রতি ১০০ গ্রামে ১২৮ কিলোক্যালরি, ২.২ গ্রাম প্রোটিন, ২.৩ গ্রাম চর্বি ও ২৪.১ গ্রাম শর্করা।
সারণিতে ডিম পোলাও আলাদা করে নেই, আর ঘরে রান্না করা পদের পুষ্টিমান নির্ভর করে চাল, ঘি ও তেলের পরিমাণ, দুধ এবং কতটা খাওয়া হচ্ছে তার ওপর। ওপরের সংখ্যাগুলো আলাদা আলাদা খাবারের মানদণ্ড, এই রেসিপির পুষ্টি-লেবেল নয়। যাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়ন্ত্রিত খাদ্যতালিকা মেনে চলেন, তাঁরা কতটা খাবেন সে বিষয়ে চিকিৎসক বা যোগ্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।

হাঁড়ির মসলা ও সুগন্ধি উপকরণ
বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায় মসলা হলো যেকোনো সুগন্ধি উদ্ভিদ, উদ্ভিদের অংশ বা উদ্ভিজ্জ পণ্য, যা খাবারে স্বাদ ও গন্ধ আনতে ব্যবহৃত হয়; এর মূল্য এর সুগন্ধে, অর্থাৎ উদ্বায়ী তেলে। নানা মসলা আসে উদ্ভিদের নানা অংশ থেকে: আদা ও হলুদ রাইজোম বা কন্দ থেকে, দারুচিনি বাকল থেকে, জিরা ও মরিচ ফল থেকে, আর এলাচ ও জয়ফল বীজ থেকে। জ্ঞানকোষটি জানায়, জনপ্রিয় গরম মসলা হলো লবঙ্গ, গোলমরিচ, দারুচিনি ও এলাচের মিশ্রণ, যা মূলত বিশেষ মাংসের তরকারি ও চালের পদে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে আদা, রসুন, হলুদ, পেঁয়াজ, মরিচ ও ধনিয়া সাধারণত চাষ হয়, তবে অন্যান্য মসলার বড় অংশ আমদানি হয় ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে।
রেসিপির জয়ফল হলো মিরিস্টিকা ফ্রাগ্রানস নামের চিরসবুজ গাছের শুকনো পাকা বীজ। গাছটি ১০ থেকে ২০ মিটার উঁচু হয়, এর আদি নিবাস ইন্দোনেশিয়ার মালুকু (মলুক্কা) দ্বীপপুঞ্জ, আর চাষ হয় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, বাংলাদেশে পোলাও, বিরিয়ানি ও তেহারির মতো বিশেষ পদে সুগন্ধি হিসেবে জয়ফলের কদর অনেক।
বাংলাদেশের রান্নাঘরের তেজপাতা হলো ভারতীয় তেজপাতা, সিনামোমাম তামালা, লরেল পরিবারের একটি গাছ, যার আদি নিবাস উত্তর ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার ও আশপাশের দেশ। তথ্যসূত্রগুলো মনে করিয়ে দেয়, একে প্রায়ই ভূমধ্যসাগরীয় বে লরেলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, যা ভিন্ন উদ্ভিদ: তেজপাতা প্রায় দ্বিগুণ লম্বা, জলপাই-সবুজ, পাতার দৈর্ঘ্য বরাবর তিনটি শিরা থাকে, আর এর গন্ধ কাসিয়া বা দারুচিনির মতো। সবুজ এলাচ হলো আদা পরিবারের বহুবর্ষজীবী বীরুৎ এলেটারিয়া কার্ডামোমাম, যার আদি নিবাস দক্ষিণ ভারত। আসল দারুচিনি শ্রীলঙ্কার আদি ছোট চিরসবুজ গাছ সিনামোমাম ভেরামের ভেতরের বাকল, যদিও কাসিয়াকেও দারুচিনি নামে ডাকা হয়। জিরা হলো ধনিয়া-গাজরের পরিবারের (অ্যাপিয়েসি) একবর্ষজীবী বীরুৎ কিউমিনাম সাইমিনামের শুকনো বীজ।
শেষবার দমে রাখার আগে রেসিপিতে যে কেওড়া জল ছিটানো হয়, তা আসে কেয়া গাছ থেকে, যার বৈজ্ঞানিক নাম প্যানডানাস ওডোরিফার। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে গাছটি প্রচুর জন্মায়। এর পুরুষ ফুল থেকে একটি সুগন্ধি তেল ও সুগন্ধি নির্যাস বের করা হয়, যা প্রায় পুরোটাই ব্যবহার হয় কেওড়া জল নামের পাতলা জলীয় নির্যাস হিসেবে; এটি বেশ পাতলা করা থাকে এবং টেবিল চামচ মেপে ব্যবহার করা যায়। ঘি হলো পরিশোধিত মাখন: সাধারণত গরু বা মহিষের দুধের মাখন জ্বাল দিয়ে, ওপরের ময়লা ফেলে দিয়ে স্বচ্ছ চর্বিটুকু রাখা হয়। এর স্মোক পয়েন্ট, অর্থাৎ যে তাপমাত্রায় ধোঁয়া উঠতে শুরু করে, প্রায় ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস; তাই ডুবো তেলে ভাজার জন্য এটি উপযোগী, আর বিরিয়ানির মতো চালের পদেও এর প্রচলিত ব্যবহার আছে।
তাজা উপকরণগুলো বাংলাদেশের মাঠের ফসল। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, পেঁয়াজ (অ্যালিয়াম সেপা) সব জেলায় চাষ হয়, সবচেয়ে বেশি ফরিদপুরে, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বারি পেঁয়াজ-১ নামে একটি জাত অবমুক্ত করেছে। রসুন সারা দেশে চাষ হয়, বিশেষ করে ফরিদপুর, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, ঢাকা ও কুমিল্লায়। আদা উঁচু জমি ও পাহাড়ের ঢালে বৃষ্টিনির্ভর ফসল হিসেবে চাষ হয়; দিনাজপুর, রংপুর, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি এর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। মরিচের আদি নিবাস মেক্সিকো, আর কাঁচা ও শুকনো দুই ধরনের মরিচই বাংলাদেশের তরকারিতে ব্যবহৃত হয়। টমেটোর আদি নিবাস গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আমেরিকা; বারির একাধিক জাত আছে, যার কয়েকটি গরম মৌসুমেও চাষ করা যায়।
খাদ্যতালিকায় মসলার ভূমিকা নিয়ে আইএনএফএসের সারণি একটি সতর্কতাও যোগ করে: মসলা অল্প পরিমাণে ব্যবহৃত হয় বলে পুষ্টি গ্রহণে এর অবদান খুব সীমিত, যদিও কাঁচা মরিচের মতো তাজা মসলা টাটকা অবস্থায় ব্যবহার করলে ভালো পরিমাণ ভিটামিন সি দেয়।

ডিম ও বেঁচে যাওয়া খাবার নিরাপদে রাখা
রেসিপিটি শুরু হয় সেদ্ধ ডিম দিয়ে, আর পদটি আগে রান্না করে রাখা বা পরের বেলার জন্য তুলে রাখা হতে পারে; তাই ডিম নিয়ে খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা পরামর্শ এখানে প্রাসঙ্গিক। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) তাদের ভোক্তা নির্দেশিকা 'হোয়াট ইউ নিড টু নো অ্যাবাউট এগ সেফটি'-তে (সর্বশেষ সংশোধন ২০২৪ সালের মার্চে) সতর্ক করেছে, পরিষ্কার ও না-ফাটা খোসার তাজা ডিমেও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। আক্রান্ত বেশির ভাগ মানুষের সংক্রমণের ১২ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডায়রিয়া, জ্বর, পেটে খিঁচুনি ও বমি হয়। শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল মানুষের গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বেশি।
ডিম কেনা, রাখা, রান্না ও পরিবেশন নিয়ে এফডিএর নির্দেশনার মধ্যে আছে:
- খোসা পরিষ্কার ও না-ফাটা হলে তবেই ডিম কিনুন।
- পরিষ্কার রেফ্রিজারেটরে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় ডিম রাখুন।
- কুসুম ও সাদা অংশ দুটোই শক্ত না হওয়া পর্যন্ত ডিম রান্না করুন; ডিমযুক্ত পদ ১৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত রান্না করতে হবে।
- শক্ত করে সেদ্ধ ডিম, খোসাসহ বা খোসা ছাড়ানো, রান্নার এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবহার করুন বা খেয়ে ফেলুন।
- রান্না করা ডিমের পদ বেঁচে গেলে রেফ্রিজারেটরে রাখুন এবং তিন থেকে চার দিনের মধ্যে খান; বেশি পরিমাণ হলে কয়েকটি অগভীর পাত্রে ভাগ করে রাখুন, যাতে দ্রুত ঠান্ডা হয়।
- পরিবেশনের আগে রান্না করা ডিমের পদ ভালোভাবে, ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত, গরম করুন।
- রান্না করা ডিম বা ডিমের পদ কখনো দুই ঘণ্টার বেশি রেফ্রিজারেটরের বাইরে রাখবেন না; তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে এক ঘণ্টার বেশি নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নন-টাইফয়েডাল সালমোনেলা বিষয়ক তথ্যপত্রে এই ব্যাকটেরিয়াকে বিশ্বে ডায়রিয়াজনিত রোগের চারটি প্রধান কারণের একটি বলা হয়েছে; মানুষ সাধারণত দূষিত প্রাণিজ খাবার, মূলত ডিম, মাংস, পোলট্রি ও দুধ খেয়ে এতে আক্রান্ত হয়। পেশাদার ও ঘরের রাঁধুনি উভয়ের জন্য ডব্লিউএইচওর 'নিরাপদ খাবারের পাঁচ চাবিকাঠি' হলো: পরিষ্কার রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, ভালোভাবে রান্না করা, খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা, এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা। খাদ্যে বিষক্রিয়া হয়েছে বলে মনে হলে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবাদাতার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয় দুই সংস্থাই।
ছবি: Rocky Masum / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ (২০১৩), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৪-২৫), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (দ্য সায়েন্টিফিক ওয়ার্ল্ড জার্নাল, ২০১৬), প্লস ওয়ান (২০২১), যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)