২০২৬ সালের এপ্রিলে মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারে দেশের গাছপ্রেমীদের কাছে ‘নটো ক্যাকটাস’ নামে পরিচিত একটি ক্যাকটাসে হলুদ ফুল ফোটে। গাছটি প্রায় তিন বছর আগে থাইল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল। সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ আশুতোষ কুমার বিশ্বাসের দাবি, বাংলাদেশে সম্ভবত এই প্রথম নটো ক্যাকটাসে ফুল ফুটল। জাগো নিউজ২৪ ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল জানায়, ফুলটি দেখতে প্রতিদিন গাছপ্রেমীরা সেখানে ভিড় করছিলেন। ‘দেশে প্রথম’ কথাটি তাঁরই দাবি; দ্য এগ্রো নিউজ এমন কোনো স্বতন্ত্র নথি খুঁজে পায়নি, যা দাবিটিকে সমর্থন বা খণ্ডন করে।
‘নটো ক্যাকটাস’ হলো নটোক্যাকটাস (Notocactus) নামের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা এখন আর আলাদা গণ হিসেবে ব্যবহার করেন না। একসময় নটোক্যাকটাস গণে থাকা গাছগুলো এখন দক্ষিণ আমেরিকার প্যারোডিয়া (Parodia) গণের অন্তর্ভুক্ত। মাদারীপুরে যে কাঁটাময়, গোলাকার থেকে লম্বাটে, হলুদ ফুলের গাছের বর্ণনা পাওয়া গেছে, তা এই দলের সঙ্গে মেলে। তবে সেন্টার গাছটির প্রজাতির নাম জানায়নি, তাই এই প্রতিবেদনেও কোনো প্রজাতির নাম বলা হচ্ছে না।
২২৫ ধরনের ক্যাকটাসের কর্নার
হর্টিকালচার সেন্টারটি মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের মোস্তফাপুর বড় ব্রিজ এলাকায়। সেন্টারে ঢুকলেই চোখে পড়ে আলাদা একটি ক্যাকটাস কর্নার: নানা রঙের, নানা আকারের গাছ, প্রতিটির গায়ে নিজস্ব ধাঁচের কাঁটা। সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, নটো ক্যাকটাসে ফুল ফোটার সময় এই কর্নারে ২২৫ ধরনের ক্যাকটাস ছিল।
সংগ্রহের শুরুটা ব্যক্তিগত শখ থেকে। আশুতোষ কুমার বিশ্বাস প্রথমে নিজের উদ্যোগে ক্যাকটাস সংগ্রহ শুরু করেন, তাঁর ভাষায় এরপর ক্যাকটাসের প্রেমে পড়ে যান। অনলাইনে বিভিন্ন ক্যাকটাস দেখে তিনি কিনতে শুরু করেন, পাশাপাশি নানা নার্সারি ও মানুষের বাড়ি থেকেও গাছ সংগ্রহ করেন। তাঁর হিসাবে মাত্র আড়াই বছরে সংগ্রহ ২২৫ প্রজাতিতে পৌঁছায়। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে জাগো নিউজ২৪ ‘মাদারীপুরে হর্টিকালচার সেন্টারে ২০০ প্রজাতির ক্যাকটাস’ শিরোনামে সেন্টারের ক্যাকটাস নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল; ২০২৬ সালের এপ্রিলে জানানো সংখ্যা ছিল ২২৫।
সেই বসন্তে সংগ্রহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে নটো ক্যাকটাস। মূল প্রতিবেদনে গাছটিকে সাধারণত লম্বাটে ও গোলাকার বলা হয়েছে, যার কাঁটা দেখতে সুন্দর। গাছের মাথায় কাঁটার মাঝখানে ফোটা হলুদ ফুলই দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি টেনেছে।
দর্শনার্থী, দাম ও ‘প্রথম’ দাবির কথা
ফুল ফোটার খবরে অনেকে সেন্টারে আসেন। মায়ের সঙ্গে আসা এক দর্শনার্থী জাগো নিউজকে বলেন, ক্যাকটাস তাঁর খুব ভালো লাগে, ফুলটি অনেক সুন্দর, আর গাছটির চারা পাওয়া গেলে তিনি একটি সংগ্রহ করবেন।
আরেক গাছপ্রেমী ওহিদুজ্জামান কাজল বলেন, গাছ তাঁর সবসময়ই ভালো লাগে, আর ব্যতিক্রমী গাছ হলে তো কথাই নেই; তাই খবর শুনেই দেখতে এসেছেন। তাঁর কথায়, ‘ফুলটি দেখতে খুব সুন্দর। বিশেষ করে কাঁটার মধ্যে হলুদ ফুল ফুটেছে, এক কথায় অসাধারণ।’
আশুতোষ কুমার বিশ্বাস জানান, তিন বছর আগে থাইল্যান্ড থেকে এই নটো ক্যাকটাসের চারা সংগ্রহ করা হয়। তিন বছর যত্নের পর প্রতিবেদনের কয়েক দিন আগে গাছে হলুদ ফুল ফোটে। তিনি বলেন, ‘সম্ভবত বাংলাদেশে এই প্রথম নটো ক্যাকটাসে ফুল ফুটেছে।’ অনেকে গাছটির চারাও চাইছেন বলে জানান তিনি। তাঁর হিসাবে গাছটি ৫০০ টাকায় কেনা হয়েছিল, এখন এর মূল্য ১,৫০০ টাকা। সেন্টার এর চারা উৎপাদনের কাজ করছে; চারা হলে খুব কম দামে সবার হাতে পৌঁছে দিতে চান তাঁরা।
এটিই দেশে এই দলের ক্যাকটাসে প্রথম ফুল কি না, প্রকাশিত তথ্য থেকে তা নিশ্চিত করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন প্যারোডিয়াকে জনপ্রিয় ও সহজে বাড়ানো যায় এমন ঘরের গাছ বলে বর্ণনা করেছে, আর বাংলাদেশের সংগ্রাহকেরা কয়েক বছর ধরেই নানা দেশ থেকে ক্যাকটাস আনছিলেন (নিচে দেখুন)। তাই উপপরিচালকের বক্তব্য তাঁর নিজের ‘সম্ভবত’ শব্দসহ তুলে ধরা হলো।
‘নটো ক্যাকটাস’ কী: নটোক্যাকটাস থেকে প্যারোডিয়া
প্যারোডিয়া গণটির বর্ণনা দেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্লোস লুইস স্পেগাজিনি, ১৯২৩ সালে। প্যারাগুয়ের উদ্ভিদজগৎ নিয়ে শুরুর দিকের গবেষক দোমিঙ্গো পারোদির নামে এর নাম রাখা হয়। নটোক্যাকটাসকে আলাদা গণ হিসেবে প্রকাশ করেন আলবের্তো ভয়তেখ ফ্রিচ, ১৯২৮ সালে, কে. শুমানের আগের একটি নামের ভিত্তিতে। দশকের পর দশক টবের অনেক জনপ্রিয় ক্যাকটাস এই নামে বিক্রি হয়েছে।
উদ্ভিদবিজ্ঞানী ডেভিড হান্ট ও সহকর্মীদের এবং রেটো নিফেলারের অঙ্গসংস্থান ও গঠনভিত্তিক গবেষণার পর নটোক্যাকটাস এবং সংশ্লিষ্ট ব্রাসিলিক্যাকটাস, ব্রাসিলিপ্যারোডিয়া, এরিওক্যাকটাস ও উইগিনসিয়া গণকে প্যারোডিয়ার সঙ্গে একীভূত করা হয়। নিফেলারের বিন্যাসে আগের নটোক্যাকটাস গাছগুলো প্যারোডিয়া উপগণের ভেতরে ‘নটোক্যাকটাস’ নামের একটি দল। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি (আরএইচএস) তাদের উদ্ভিদ তথ্যভান্ডারে নটোক্যাকটাসকে স্বীকৃত নাম নয়, সমার্থক নাম হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির এক্সটেনশন গার্ডেনার প্ল্যান্ট টুলবক্সও জানায়, প্যারোডিয়া ‘আগে পরিচিত ছিল’ ব্রাসিলিক্যাকটাস, এরিওক্যাকটাস ও নটোক্যাকটাস নামে। পুরোনো নাম এখনো লেবেলে টিকে আছে: যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ম্যাথাই বোটানিক্যাল গার্ডেনসে তোলা উইকিমিডিয়া কমন্সের একটি ছবিতে প্যারোডিয়া লেনিংহাউসির গায়ে এখনো ‘নটোক্যাকটাস লেনিংহাউসি’ লেবেল দেখা যায়।
গণটির প্রজাতির সংখ্যা নিয়ে সূত্রভেদে পার্থক্য আছে। উইকিপিডিয়ার প্যারোডিয়া নিবন্ধে প্রায় ৬৫টি প্রজাতির কথা বলা হয়েছে; এনসি স্টেট এক্সটেনশনের টুলবক্সে স্বীকৃত প্রজাতি প্রায় ৭১টি। যে হিসাবই ধরা হোক, এটি ক্যাকটাস পরিবার ক্যাকটেসির মাঝারি আকারের একটি গণ।
মূল প্রতিবেদনের একটি তথ্য সংশোধন করা দরকার, গাছটির আদি বাসস্থান নিয়ে। সেখানে বলা হয়েছিল, নটো ক্যাকটাস আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, দক্ষিণ ব্রাজিল, মেক্সিকোসহ বেশ কিছু দেশে জনপ্রিয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানের তথ্যসূত্র অনুযায়ী প্যারোডিয়া কেবল দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয় গাছ: উত্তর-পশ্চিম আর্জেন্টিনা ও দক্ষিণ-পশ্চিম বলিভিয়ায় আন্দিজের পূর্ব ঢাল, এবং উত্তর-পূর্ব আর্জেন্টিনা, দক্ষিণ ব্রাজিল, পূর্ব প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ের নিচু তৃণভূমি (পাম্পাস); এনসি স্টেট কলম্বিয়ার নামও উল্লেখ করেছে। আগের নটোক্যাকটাস প্রজাতিগুলো মূলত দক্ষিণ ব্রাজিলে, বিশেষ করে রিও গ্রান্দে দো সুল রাজ্যে, সেখান থেকে উরুগুয়ে ও উত্তর-পূর্ব আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত। অনেক ক্যাকটাসের প্রধান আবাস মেক্সিকো এই গণের আদি বিস্তারের মধ্যে পড়ে না, তাই এই প্রতিবেদনে মেক্সিকোর নাম রাখা হয়নি।

প্যারোডিয়া দেখতে কেমন, ফুল ফোটে কীভাবে
প্যারোডিয়া গাছ ছোট গোলক থেকে শুরু করে প্রায় এক মিটার উঁচু স্তম্ভের মতো পর্যন্ত হয়। সব প্রজাতির গায়ে গভীর খাঁজ (রিব) ও কাঁটা থাকে, আর ফুল ফোটে একটি একটি করে, গাছের মাথায় বা মাথার কাছে; কিছু প্রজাতির গোড়া থেকে নতুন চারা (অফসেট) বের হয়। নটোক্যাকটাস দলের জন্য নিফেলারের বর্ণনায় কাণ্ড চ্যাপ্টা-গোলাকার, গোলাকার বা স্তম্ভাকার, কাণ্ডের কোষে পিচ্ছিল রস (মিউসিলেজ) থাকে, বাইরের ত্বক প্রায়ই শক্ত, আর ফুল চওড়া ফানেল থেকে ঘণ্টার মতো, যার গর্ভদণ্ড ও গর্ভমুণ্ড সাধারণত পাপড়ির চেয়ে ভিন্ন রঙের।
এনসি স্টেট এক্সটেনশনের বর্ণনায় ফুল ফানেল আকৃতির, কাণ্ডের মাথায় খাড়া হয়ে থাকে, সাধারণত ১ থেকে ৩ ইঞ্চি চওড়া, পাপড়ি ৭ থেকে ২০টি; প্রজাতিভেদে রং হলুদ, কমলা, লাল বা গোলাপি, আর গর্ভমুণ্ডটি স্পষ্ট ও ভিন্ন রঙের। যুক্তরাষ্ট্রে চাষে এগুলো গ্রীষ্ম থেকে শরতের শুরু পর্যন্ত ফোটে। ফল ছোট, বেরির মতো, রোমশ ও কাঁটাযুক্ত, গোলাপি আভাসহ সবুজাভ হলুদ, ভেতরে ছোট কালো বীজ।
এই দলে হলুদ ফুল বেশ সাধারণ। এনসি স্টেটের তালিকায় প্যারোডিয়া অটোনিসের কাণ্ড গোলাকার, কাঁটা লালচে ও বাঁকানো, ফুল হলুদ; প্যারোডিয়া ম্যাগনিফিকা বা ‘বেলুন ক্যাকটাস’ নীলচে সবুজ, গোলাকার, গুচ্ছ বাঁধে, ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত উঁচু, ফুল হলুদ; প্যারোডিয়া স্কোপা বা ‘সিলভার বল ক্যাকটাস’-এর কাঁটা সাদা, খাঁজ ৩০ থেকে ৪০টি, ফুল হলুদ; আর ব্রাজিলের প্যারোডিয়া লেনিংহাউসি বা ‘গোল্ডেন বল ক্যাকটাস’ ১২ ইঞ্চির বেশি উঁচু হয়, ফুল বড় ও হলুদ। আরএইচএসের বর্ণনায় লেমন বল বা ইয়েলো টাওয়ার ক্যাকটাস নামেও পরিচিত প্যারোডিয়া লেনিংহাউসির কাণ্ড একক বা গুচ্ছবদ্ধ, গোলাকার থেকে বেলনাকার, ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত উঁচু; কাঁটা খাড়া-খসখসে, সোনালি বাদামি; আর বাটির মতো লেবু-হলুদ ফুল ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার চওড়া। মাদারীপুরে বর্ণিত লম্বাটে-গোলাকার গড়ন ও হলুদ ফুল এদের কয়েকটির সঙ্গেই মেলে, তাই শুধু প্রতিবেদন দেখে প্রজাতি অনুমান করা যায় না।

প্যারোডিয়ার যত্ন: উদ্যানতত্ত্বের কর্তৃপক্ষ যা বলে
এনসি স্টেট এক্সটেনশন প্যারোডিয়াকে ছোট থেকে মাঝারি আকারের, আকর্ষণীয় কাণ্ড ও কাঁটা এবং বড় ও দৃষ্টিনন্দন ফুলের ক্যাকটাস বলে বর্ণনা করেছে, যা জনপ্রিয় ও সহজে বাড়ানো যায় এমন ঘরের গাছ। তাদের নির্দেশনা এবং আরএইচএসের প্যারোডিয়া লেনিংহাউসি বিষয়ক তথ্য মিলিয়ে যত্নের মূল কথাগুলো এমন:
- আলো: পূর্ণ রোদ থেকে আংশিক ছায়া, দিনে মোটামুটি ২ ঘণ্টা থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি সরাসরি রোদ (এনসি স্টেট); আরএইচএস প্যারোডিয়া লেনিংহাউসির জন্য পূর্ণ রোদ বা উজ্জ্বল ছাঁকা আলোর পরামর্শ দেয়।
- মাটি: পানি সহজে বের হয়ে যায় এমন বালু ও দোআঁশের অম্লীয় মিশ্রণ, অথবা ক্যাকটাস বা সাকুলেন্টের তৈরি টবের মিশ্রণ (এনসি স্টেট); আরএইচএস সাধারণ ক্যাকটাস কম্পোস্টের কথা বলে, যার ভিত দোআঁশ বা বালু এবং মাটি অম্লীয় থেকে নিরপেক্ষ।
- পানি: বাড়ন্ত মৌসুমে পরিমিত, দুই সেচের মাঝে মাটি পুরোপুরি শুকাতে দিতে হবে, পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না, গাছের গা শুকনো রাখতে হবে; শীতে গাছ শুকনো রাখতে হবে (এনসি স্টেট)। আরএইচএস বসন্তের মাঝামাঝি থেকে গ্রীষ্মের শেষ পর্যন্ত পরিমিত পানির পরামর্শ দেয়।
- খাবার: আরএইচএস প্যারোডিয়া লেনিংহাউসির জন্য বাড়ন্ত সময়ে প্রতি ৬ থেকে ৮ সপ্তাহে কম নাইট্রোজেনের তরল সার দেওয়ার কথা বলে।
- তাপমাত্রা: খোলা জায়গায় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ৯ থেকে ১১ নম্বর অঞ্চলে টেকে, ঠান্ডা অঞ্চলে ঘরে আনতে হয় (এনসি স্টেট); উইকিপিডিয়ার প্যারোডিয়া নিবন্ধ অনুযায়ী যেখানে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে, সেখানে গাছ ঘরের ভেতরে রাখতে হয়।
- বংশবিস্তার: বীজ থেকে (এনসি স্টেট); আরএইচএস বসন্ত বা গ্রীষ্মে ১৯ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বীজ বোনার কথা বলে। সাধারণভাবে ক্যাকটাসের বংশবিস্তার কাটিং থেকেও হয়, কাটা অংশ শুকিয়ে শক্ত আবরণ পড়ার পর শিকড় গজানো হয়, আর হয় জোড় কলমে।
- সমস্যা: মিলিবাগ, মাকড় (স্পাইডার মাইট), সাদা মাছি ও জাবপোকা; অতিরিক্ত পানি বা ভেজা মাটিতে শিকড় পচা ও ছত্রাকের সংক্রমণ; খুব গরম আবহাওয়ায় কাণ্ডে রোদে পোড়া দাগ (এনসি স্টেট)। আরএইচএস মিলিবাগ ও জাবপোকার কথা বলেছে এবং প্যারোডিয়া লেনিংহাউসিকে সাধারণত রোগমুক্ত বলেছে।
ধারালো কাঁটার কারণে গাছ নাড়াচাড়ার সময় সুরক্ষা দস্তানা পরার পরামর্শও দেয় এনসি স্টেট। বাংলাদেশে যাঁরা বাড়িতে এই গাছ রাখেন, বর্ষায় জমে থাকা পানি আর গরমের মৌসুমে রোদে পোড়া নিয়ে সতর্কতাই তাঁদের জন্য সবচেয়ে জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট গাছের পোকা দমনে কী ওষুধ কতটুকু দিতে হবে, সে পরামর্শ স্থানীয় উপজেলা কৃষি অফিস থেকে নেওয়া উচিত।
ক্যাকটাস: আমেরিকা মহাদেশের গাছ
সব ক্যাকটাসই ক্যারিওফাইলেলস বর্গের ক্যাকটেসি পরিবারের সদস্য। সূত্রভেদে হিসাব আলাদা; উইকিপিডিয়ার ক্যাকটাস নিবন্ধে প্রায় ১২৫ থেকে ১৩১টি গণ এবং প্রায় ১,৪০০ থেকে ১,৮৬৬টি প্রজাতির কথা পাওয়া যায়। এদের আদি নিবাস আমেরিকা মহাদেশ, দক্ষিণে প্যাটাগোনিয়া থেকে উত্তরে পশ্চিম কানাডার কিছু অংশ পর্যন্ত। প্রাকৃতিকভাবে পুরোনো বিশ্বেও পাওয়া যায় কেবল একটি ক্যাকটাস, রিপসালিস ব্যাক্কিফেরা, যা আছে ক্রান্তীয় আফ্রিকা, মাদাগাস্কার ও শ্রীলঙ্কায়। অর্থাৎ মাদারীপুরের সংগ্রহসহ বাংলাদেশে যত ক্যাকটাস চাষ হয়, সবগুলোর আদি উৎস আমেরিকা মহাদেশ।
ক্যাকটাসকে আলাদা করে চেনায় ‘অ্যারিওল’, এক ধরনের অত্যন্ত সংকুচিত বিটপ, যা কেবল এই পরিবারেই আছে। এটি প্রায়ই পশমি বা লোমশ, আর এখান থেকেই কাঁটা, ফুল এবং কখনো নতুন শাখা বের হয়। এ কারণেই প্যারোডিয়ার ফুল কাঁটার ভেতর থেকে সোজা উঠে আসছে বলে মনে হয়। কাঁটাগুলো আসলে রূপান্তরিত পাতা। এগুলো তৃণভোজী প্রাণীকে দূরে রাখে, গাছের গায়ে আর্দ্র বাতাসের একটি স্তর আটকে রেখে পানি হারানো কমায়, ছায়া দেয়, আর কিছু প্রজাতিতে কুয়াশা থেকে আর্দ্রতা জমায়।
বেশির ভাগ ক্যাকটাসে পাতাহীন সবুজ কাণ্ডই সালোকসংশ্লেষণ করে। অনেক ক্যাকটাস ‘ক্র্যাসুলেসিয়ান অ্যাসিড মেটাবলিজম’ (সিএএম) পদ্ধতি ব্যবহার করে: রাতে, যখন পানি কম হারায়, তখন পত্ররন্ধ্র খোলে, কার্বন ডাই-অক্সাইড ম্যালিক অ্যাসিড হিসেবে জমিয়ে রাখে, আর দিনে রন্ধ্র বন্ধ রেখে সেটি দিয়ে সালোকসংশ্লেষণ করে। একটি ক্যাকটাসের ভরের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে পানি, যা মূলত কাণ্ডে জমা থাকে; খাঁজকাটা কাণ্ড খরায় কুঁচকে যায়, বৃষ্টির পর ফুলে ওঠে। ফুল অ্যারিওল থেকে ফোটে, সাধারণত নলাকার, পাপড়ির মতো অনেক টেপাল থাকে, আর রং সাদা থেকে হলুদ, লাল হয়ে ম্যাজেন্টা পর্যন্ত। পরাগায়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে মৌমাছি।
গাছের ব্যবসার জন্য বন্য ক্যাকটাস সংগ্রহ করা হয় বলে সব ক্যাকটাস বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক কনভেনশন সাইটেসের পরিশিষ্ট-২-এ তালিকাভুক্ত। এর আওতায় রপ্তানিতে সাধারণত অনুমতিপত্র লাগে, তবে কৃত্রিমভাবে বংশবিস্তার করা কিছু গাছসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে ছাড় আছে। সবচেয়ে কঠোর তালিকা পরিশিষ্ট-১-এ আছে অ্যারিওকার্পাস ও ডিসকোক্যাকটাস গণের সব প্রজাতি।
মাদারীপুর ও তার হর্টিকালচার সেন্টার
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মাদারীপুর ঢাকা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১,০৪৯.৫৯ বর্গকিলোমিটার। এর চারটি উপজেলা: কালকিনি, মাদারীপুর সদর, রাজৈর ও শিবচর। জেলার উত্তরে ফরিদপুর ও মুন্সিগঞ্জ, দক্ষিণে বরিশাল ও গোপালগঞ্জ, পূর্বে শরীয়তপুর এবং পশ্চিমে ফরিদপুর। এখানকার নদীর মধ্যে আছে পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, কুমার ও ঘাঘর, আর উল্লেখযোগ্য জলপথ মাদারীপুর বিল রুট খাল। ১৮৫৪ সালে বাকেরগঞ্জ জেলার অধীনে মাদারীপুর মহকুমা গঠিত হয়, ১৮৭৩ সালে এটি ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়, আর ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয়। বাংলাপিডিয়ায় ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ১০,৯৪,৪৫৮ জন, আর আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে কৃষির হার ৬১.৩৩ শতাংশ।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গঠিত হয় ১৯৮২ সালে। মোস্তফাপুরের মতো হর্টিকালচার সেন্টারগুলো এই অধিদপ্তরের, যেখানে ফল ও অন্যান্য উদ্যান ফসলের চারা ও কলম তৈরি হয়। ক্যাকটাসে ফুল ফোটার আগেও সেন্টারটি ও এর উপপরিচালক খবরে এসেছিলেন। ২০২৩ সালের জুনে দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, মোস্তফাপুর হর্টিকালচার সেন্টারের একটি আমগাছে একসঙ্গে আট জাতের আম ধরেছে: মিয়াজাকি, পালমার, থাই জাম্বু, কাটিমন, বারি আম-১১, কিউজাই, হিমসাগর ও বানানা। প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২২ সালে একটি উন্নত জাতের আমের চারা লাগানো হয়েছিল; ছয় মাসের মধ্যে মূল ডাল মরে গেলে গোড়া থেকে দশটি নতুন ডাল বের হয়, তাতে দশটি ভিন্ন জাতের কলম জোড়া হয়, আটটি টিকে যায়, আর প্রায় দশ ফুট উঁচু গাছটিতে এক বছরের মধ্যে ফল আসে। তখনো সেন্টারের উপপরিচালক হিসেবে উল্লিখিত আশুতোষ কুমার বিশ্বাস পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, গাছটি অভিনব কলম পদ্ধতিতে তৈরি, আর একই গাছে বিভিন্ন জাতের আমের সংমিশ্রণ থাকায় বছর জুড়ে গাছটি থেকে আম পাওয়া যাবে; পত্রিকাটি আরও জানায়, সেন্টার এ ধরনের আরও চারা তৈরির কাজ করছে।
ফলের কাজের জন্য পরিচিত এই সেন্টারে ক্যাকটাস কর্নার যোগ করে একটি বাহারি গাছের সংগ্রহ। ২০২৬ সালের এপ্রিলে নটো ক্যাকটাসের চারা তৈরি করে কম দামে বিক্রির যে পরিকল্পনার কথা আশুতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন, তা-ও জনসাধারণের জন্য চারা উৎপাদনের সেই একই ধারার কাজ।
বাংলাদেশে ক্যাকটাস সংগ্রহের চল
মাদারীপুরের এই ফুল ফোটার কয়েক বছর আগে থেকেই দেশে ক্যাকটাসের প্রতি আগ্রহ বাড়ছিল, সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে তা দেখা যায়। ২০২২ সালের জুনে দৈনিক ইত্তেফাক কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা থেকে জানায়, এক পুলিশ সার্জেন্ট বাড়ির ছাদ ও উঠানে ছয়টি শেডে প্রায় ৪০০ প্রজাতির, মোট প্রায় ৪০ হাজার ক্যাকটাসের সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন। তাঁর প্রথম গাছটি আসে ভারত থেকে, পরে তিনি থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্যাকটাস আনেন; তাঁর বাবার ভাষ্য, বাগানটির শুরু ২০১৯ সালে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রথম আলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যার এক শিক্ষার্থীর কথা লেখে, যিনি ক্যাম্পাসের শাটল ট্রেন স্টেশনে ভাঁজ করা টেবিলে ক্যাকটাস বিক্রি করতেন; তাঁর সংগ্রহে ছিল ২০ প্রজাতি, যার কিছু তিনি লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা, নওগাঁ ও বগুড়ার মতো সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে জোগাড় করেন। ২০২৫ সালের আগস্টে একই পত্রিকা জানায়, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আয়োজনে নগরের লালদিঘি মাঠে বার্ষিক বৃক্ষমেলায় প্রায় ২,০৬৫ প্রজাতির চারা উঠেছে, তার মধ্যে দেশি-বিদেশি ২১০ প্রজাতির ক্যাকটাস। একটি স্টলেই ছিল প্রায় ১২০ ধরনের ক্যাকটাস, যার মধ্যে গোল্ডেন ব্যারেল ও ম্যামিলারিয়া হানিয়ানা, দাম ২০০ থেকে ২,০০০ টাকা।
সরকারি সংগ্রহও আছে। ঢাকার মিরপুরে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান বন অধিদপ্তর পরিচালনা করে; প্রায় ৮৪ হেক্টরের উদ্যানটি ৫৭টি অংশে ভাগ করা, তার মধ্যে একটি ক্যাকটাস হাউসও রয়েছে।
ছবি: Sergei / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ২৪ (২৫ এপ্রিল ২০২৬; ১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর শিরোনাম), রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটির উদ্ভিদ তথ্যভান্ডার (প্যারোডিয়া লেনিংহাউসি; নটোক্যাকটাস), নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন গার্ডেনার প্ল্যান্ট টুলবক্স (প্যারোডিয়া), উইকিপিডিয়া (প্যারোডিয়া; ক্যাকটাস; বাংলাদেশ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর), বাংলাপিডিয়া (মাদারীপুর জেলা), দৈনিক ইত্তেফাক (৩ জুন ২০২৩; ২২ জুন ২০২২), প্রথম আলো (২৬ নভেম্বর ২০২৩; ১ আগস্ট ২০২৫)





মন্তব্য
(০)