ময়মনসিংহ ও আশপাশের অঞ্চলের প্রধান শিক্ষা ও রেফারেল হাসপাতাল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের ভেতরে একটি গাভি ঘুরে বেড়ানোর ছবি ২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কড়া সমালোচনা ওঠে। ১৫ মে ২০২৬, শুক্রবার রাতে স্থানীয় একটি ফেসবুক গ্রুপে প্রথম প্রকাশিত ছবিটিতে দেখা যায়, গাভিটি হাসপাতালের তৃতীয় তলায় শিশু সার্জারি বিভাগের সামনের বারান্দায় ঘুরছে। হাসপাতালের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে এবং গাভিটি ভেতরে ঢুকতে দেওয়ার জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি নিয়ে ১৬ মে প্রথম আলো এবং ১৭ মে ২০২৬ জাগো নিউজ ২৪ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কোনো প্রতিবেদনেই কোনো রোগী বা দর্শনার্থী আহত হওয়ার কথা বলা হয়নি, গাভিটির মালিক কে, তা-ও শনাক্ত করা হয়নি।
ছবিতে যা দেখা গেছে
দুটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছবিতে দেখা যায়, হাসপাতালের ভেতরের বারান্দা দিয়ে কালো-সাদা রঙের বড় একটি গাভি হেঁটে বেড়াচ্ছে। প্রথম আলো জানায়, গাভিটি দাঁড়িয়ে ছিল তৃতীয় তলায় শিশু সার্জারি বিভাগের দিক দেখানো একটি সাইনবোর্ডের সামনে। এক পাশে রোগী বহনের একটি ট্রলি ছিল, আর গাভিটির সামনে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জটলা দেখা যায়।
যিনি ছবিটি পোস্ট করেন, তিনি লেখেন যে হাসপাতালের ভেতরে শিশু সার্জারি বিভাগে গরু চলাচল করছে, এবং প্রশ্ন তোলেন, বিষয়টি দেখার কি কেউ নেই। পোস্টে হাসপাতালের পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ১৫ মে রাত ১০টার দিকের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখার অনুরোধ জানানো হয়। জাগো নিউজ জানায়, ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
পোস্টের নিচে করা একটি মন্তব্য দুটি পত্রিকাই উদ্ধৃত করেছে। ওই মন্তব্যে দাবি করা হয়, গাভিটি সাধারণত মেডিকেল কলেজের পশ্চিম পাশের ময়লার স্তূপে যা পায় তা খেয়ে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায় এবং কলেজ গেট ও প্রধান সড়কের পাশে নিয়মিত দেখা যায়। মন্তব্যে যুক্তি দেওয়া হয়, এর জন্য হাসপাতালের পরিচালক নন, গাভির মালিক দায়ী; মালিককে খুঁজে বের করে পরিচালককে জানানো উচিত। এগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি মন্তব্যের দাবি; কোনো প্রতিবেদনই আলাদাভাবে তা যাচাই করেনি।

হাসপাতালের বক্তব্য ও নাগরিক সংগঠনের মত
হাসপাতালের পক্ষে কথা বলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ গুদাম কর্মকর্তা ঝন্টু সরকার। জাগো নিউজ তাঁকে উদ্ধৃত করে লেখে, ‘কুকুর-বিড়াল দৌড়ে ঢুকে যায়, এটা এক রকম। কিন্তু এত বড় গরু হাসপাতালে ঢুকে ঘুরে বেড়াবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। নিরাপত্তাকর্মীরা কেন বিষয়টি দেখেনি, তা খতিয়ে দেখা হবে। অফিসে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রথম আলোয় প্রকাশিত তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন, হাসপাতালের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন; তাহলে ভেতরে গরু ঢুকবে কেন, আর নিরাপত্তাকর্মীরা কেন তা দেখলেন না। পরদিন অফিসে গিয়ে তাঁদের বিষয়ে একটি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। প্রথম আলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবস্থান তুলে ধরে লেখে, বিষয়টি নজরে আনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতালের অভ্যন্তরে এর আগেও আমরা কুকুর ঘুরে বেড়ানোর ছবি দেখেছি। আজ গাভি ঘুরে বেড়ানোর ছবি দেখলাম। হাসপাতাল হচ্ছে রোগীর চিকিৎসাসেবার সর্বশেষ ভরসার জায়গা। হাসপাতালকে যেকোনো ধরনের জীবজন্তু থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। এটির জন্য সরকার থেকে যথাযথ লোক নিয়োগ করা আছে। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে আজ এই অবস্থা। এ ঘটনায় যাঁরা দায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সুজন বাংলাদেশের একটি নাগরিক সংগঠন, সুশাসনের দাবিতে কাজ করার লক্ষ্যে ২০০২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির প্রধান কার্যালয় ঢাকার মোহাম্মদপুরে। কেন্দ্রীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে এটি কাজ করে। বদিউল আলম মজুমদার ছিলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে কাজের জন্য সুজন বেশি পরিচিত, তবে সংগঠনটি বিভিন্ন সামাজিক বিষয়েও কথা বলে।
এক হাজার শয্যার হাসপাতালে তিন গুণের বেশি রোগী
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষা হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানটির শুরু লিটন মেডিকেল স্কুল হিসেবে। ১৯২৪ সালে তৎকালীন বাংলার গভর্নর আর্ল অব লিটন লাইসেনশিয়েট অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (এলএমএফ) কোর্সের চিকিৎসক তৈরির জন্য ময়মনসিংহে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬২ সালে স্কুলটি উন্নীত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ নাম পায়, ৩২ জন শিক্ষার্থীর প্রথম ব্যাচ নিয়ে এমবিবিএস কোর্স চালু হয় এবং কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯৭২ সালে কলেজ ও হাসপাতাল বাঘমারা থেকে শহরের পূর্ব দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে চরপাড়ার বর্তমান ক্যাম্পাসে সরিয়ে নেওয়া হয়। ক্যাম্পাসের আয়তন প্রায় ৮৪ একর। কলেজটিতে ২০১১ সাল থেকে দন্তচিকিৎসার স্নাতক (বিডিএস) কোর্সও পড়ানো হয়, আর এখান থেকে প্রকাশিত হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল জার্নাল।
হাসপাতালটির শয্যা ১ হাজারটি, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এর চেয়ে অনেক বেশি রোগীর চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন ২০২৩-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বণিক বার্তা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জানায়, ২০২৩ সালে হাসপাতালটির শয্যা দখলের হার ছিল ৩২৬ দশমিক ৫ শতাংশ; অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন শয্যার চেয়ে প্রায় সোয়া তিন গুণ রোগী ভর্তি ছিলেন। ২০২৩ সালে বহির্বিভাগে ১১ লাখ ৫২ হাজার ৫৯৪ জন রোগী চিকিৎসা নেন, জরুরি বিভাগে আসেন ৬৯ হাজার ৫৯০ জন এবং ভর্তি হন মোট ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫৮১ জন।
হাসপাতালের কর্মকর্তারা বণিক বার্তাকে জানান, প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার রোগী হাসপাতালে আসেন; এর মধ্যে অন্তর্বিভাগে গড়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার এবং বহির্বিভাগে প্রায় ৫ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪২৫টি, যার এক শর বেশি পদ খালি ছিল। রোগীরা মেঝেতে, করিডরে ও সিঁড়িতে পাতা বিছানায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন; শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডে চলাফেরার জায়গাই প্রায় ছিল না; আর ৭০ শয্যার নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) প্রতি শয্যায় ছয় থেকে সাতটি শিশু ভর্তি রাখতে হচ্ছিল। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ভান্ডার) ডা. আলী রেজা সিদ্দিকী জানান, ২০১৭ সালে দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর মধ্যে প্রথম এই হাসপাতালেই মহাসড়কের দুর্ঘটনা ও জরুরি রোগীদের জন্য দিনরাত চালু থাকা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু হয়।
একই প্রতিবেদনে আঞ্চলিক চিত্রও তুলে ধরা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ বিভাগে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে মোট শয্যা ১ হাজার ৬৫১টি, যা দেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে কম। মাধ্যমিক পর্যায়ের হাসপাতালেও এ বিভাগে শয্যা সবচেয়ে কম, ৭৭০টি; আর টারশিয়ারি হাসপাতালে মোট ২ হাজার শয্যা নিয়ে বিভাগটি নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়। চিকিৎসকেরা বলেন, আশপাশের জেলাগুলোতে ভালো মানের হাসপাতাল না থাকায় সেসব এলাকার রোগীরাও এই হাসপাতালে ছুটে আসেন।

ওয়ার্ডের অবস্থা নিয়ে আগের অভিযোগ
হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ নিয়ে খবর এবারই প্রথম নয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও যুগান্তরের খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নবজাতক ওয়ার্ডে ভর্তি শিশুদের স্বজনেরা শেখ রাসেল স্ক্যানু (এনআইসিইউ) ওয়ার্ডের বিছানায় ছারপোকার উপদ্রবের প্রতিবাদে কলেজ গেটের পাশে চরপাড়ায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। স্বজনদের অভিযোগ ছিল, ছারপোকার উপদ্রব বেড়েছে, শিশুরা কামড় খাচ্ছে, আর বারবার জানানোর পরও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়নি। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম তখন বলেন, ৫০ শয্যার নবজাতক ওয়ার্ডে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ রোগী ভর্তি থাকে; একসঙ্গে সব শয্যা বদলানো সম্ভব নয়, তাই প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাতটি শয্যা বদলে ওয়ার্ডটি ছারপোকামুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিচালকের আশ্বাসে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেন।
গাভির ছবি ভাইরাল হওয়ার আগের কয়েক সপ্তাহে হামের প্রাদুর্ভাবেও হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে চাপ ছিল। দেশ রূপান্তর ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল জানায়, ১৭ মার্চ থেকে তখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ১৪৩টি শিশু ভর্তি হয়েছে, যাদের পাঁচজন মারা গেছে; আর রোগীর চাপ সামলাতে ৩০ মার্চ থেকে হাসপাতালের আটতলার কেবিন এলাকায় ৬৪ শয্যার একটি পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ বলেন, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম, অর্থাৎ তাদের টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। ২০২৬ সালের ৫ মে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম হাসপাতালের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ১৭ মার্চ থেকে সেদিন সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ১ হাজার ৮৮টি শিশু ভর্তি হয়েছে, যাদের ৯৮৪টি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এবং ৭৯টি চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ৬৪ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ডে জায়গা না থাকায় বাড়তি রোগীদের মেঝেতে রাখতে হচ্ছে।
অসুস্থ শিশু ও নবজাতকে ভরা এমন ভিড়ের ওয়ার্ডের প্রেক্ষাপটেই শিশু সার্জারি বিভাগের সামনে তৃতীয় তলায় গাভি ঘোরার ছবি এত তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
রোগীদের এলাকা থেকে প্রাণী দূরে রাখা কেন জরুরি
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষগুলো হাসপাতালে প্রাণীর উপস্থিতিকে মূলত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জুনোসিস বা প্রাণিবাহিত রোগের সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে: যে সংক্রামক রোগ মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণী থেকে মানুষের দেহে আসে। সংস্থাটির তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, এ ধরনের রোগজীবাণু ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা পরজীবী হতে পারে এবং সরাসরি সংস্পর্শে কিংবা খাদ্য, পানি বা পরিবেশের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। কৃষিকাজে, সঙ্গী হিসেবে এবং প্রকৃতিতে প্রাণীর সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে বিশ্বজুড়ে এগুলো জনস্বাস্থ্যের বড় সমস্যা।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিবেশগত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশিকায় বিষয়টি সরাসরি আলোচনা করেছে। ২০০৩ সালে প্রকাশিত এবং ২০১৯ সালের জুলাইয়ে সর্বশেষ হালনাগাদ করা এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে থাকা প্রাণী প্রাণিবাহিত রোগজীবাণুর উৎস হতে পারে, যা রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমিত করার আশঙ্কা তৈরি করে। প্রাণী অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর আধার হিসেবেও কাজ করতে পারে, এবং প্রাণীটি উপস্থিত থাকার সময় সেই জীবাণু হাসপাতালে ঢুকে পড়তে পারে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাণী থেকে মানুষে এসব রোগ ছড়ায় কামড়, আঁচড়, বাতাসে ভাসমান কণা, বহিঃপরজীবী, অসাবধানে মুখে চলে যাওয়া এবং দূষিত মাটি, খাবার, পানি বা অপাস্তুরিত দুধের সংস্পর্শের মাধ্যমে।
সিডিসির নির্দেশিকা মূলত সেই প্রাণীদের নিয়ে, যাদের ইচ্ছা করে হাসপাতালে আনা হয়, যেমন সেবা-প্রাণী, থেরাপি-প্রাণী ও গবেষণার প্রাণী। নির্দেশিকায় এ-ও বলা হয়েছে, গবেষণাগারের বাইরে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রাণিবাহিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। তবে উপদ্রবকারী প্রাণী নিয়ে নির্দেশিকার পরামর্শ সাধারণ: জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের ভবনের ভেতর থেকে এগুলো দূর করা উচিত; আধুনিক ব্যবস্থাপনায় যেসব খাদ্যের উৎস ও পরিবেশ এদের আকৃষ্ট করে, সেগুলো দূর করা এবং ভবনে ঢোকা ঠেকানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। অপারেশন থিয়েটার এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল রোগীদের এলাকাকে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কোনো পত্রিকার প্রতিবেদনেই বলা হয়নি যে গাভিটি কারও ক্ষতি করেছে বা কোনো রোগ ছড়িয়েছে। প্রতিবেদনগুলোর, হাসপাতালের কর্মকর্তার এবং সুজন প্রতিনিধির উদ্বেগ ছিল একটাই: এত বড় একটি প্রাণী কীভাবে হাসপাতালের নিরাপত্তা পেরিয়ে রোগীতে ভরা ওয়ার্ড এলাকায় পৌঁছে গেল।
ছেড়ে দেওয়া গবাদিপশু নিয়ে আইন কী বলে
ছেড়ে দেওয়া গবাদিপশুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পুরোনো ও নতুন দুই ধরনের আইনই প্রযোজ্য। এখনো বলবৎ থাকা গবাদিপশু অনধিকার প্রবেশ আইন, ১৮৭১ (দ্য ক্যাটল-ট্রেসপাস অ্যাক্ট, ১৮৭১ সনের ১ নং আইন) ‘গবাদিপশু’র সংজ্ঞা বেশ বিস্তৃত করে হাতি, উট, মহিষ, ঘোড়া, টাট্টু ঘোড়া, খচ্চর, গাধা, শূকর, ভেড়া ও ছাগলকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছে। আইনের ১১ ধারা অনুযায়ী, সরকারি সড়ক, প্রমোদ-উদ্যান, বাগান, খাল, পয়োনিষ্কাশন স্থাপনা ও বাঁধের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং পুলিশ কর্মকর্তা এসব জায়গার ক্ষতি করছে বা এসব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন যেকোনো গবাদিপশু আটক করতে পারেন, এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম খোঁয়াড়ে পাঠাতে হবে। ১২ ধারা অনুযায়ী, আটক প্রতিটি পশুর জন্য খোঁয়াড়রক্ষক সরকারি গেজেটে নির্ধারিত হারে জরিমানা আদায় করবেন, এবং সেই অর্থ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হবে।
শহরের জন্য স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ ময়মনসিংহসহ সিটি করপোরেশনগুলোকে একই ধরনের ক্ষমতা দিয়েছে। আইনের তফসিলে বর্ণিত কার্যাবলি অনুযায়ী, করপোরেশন প্রবিধান করে রাস্তায়, জনসাধারণের ব্যবহৃত স্থানে বা কর্ষিত জমিতে বন্ধনহীন অবস্থায় ইতস্তত বিচরণরত পশু আটক করে খোঁয়াড়ে আবদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করতে পারে; গবাদিপশু আটকে রাখার জন্য খোঁয়াড় বানাতে এবং আটক পশুর জন্য জরিমানা ও ফি আদায়ের বিধান করতে পারে; আর করপোরেশন যেসব রাস্তা বা স্থানে নিষেধ করেছে, সেখানে পশু বেঁধে বা আটকে রাখা যাবে না। তফসিলে আরও বলা হয়েছে, করপোরেশনের লাইসেন্স ও তার শর্ত ছাড়া কেউ নগরে দুধ বিক্রির জন্য দুগ্ধবতী গবাদিপশু পালন করতে পারবেন না। ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো জীবজন্তু আটক ও খোঁয়াড়ে আবদ্ধ করা এবং গবাদিপশু বিক্রির নিবন্ধনকে উপ-আইনের বিষয় হিসেবেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
মালিকের দায়িত্বের দিকটি বলেছে প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ (২০১৯ সনের ১২ নং আইন)। ১০ জুলাই ২০১৯ থেকে কার্যকর এই আইন দ্য ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট, ১৯২০ রহিত করে প্রণীত হয়। আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রাণীর মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীর দায়িত্ব হলো যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রাণীর প্রতি কল্যাণকর ও মানবিক আচরণ করা এবং নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকা। ৭ ধারায় বলা হয়েছে, আইনে উল্লিখিত কারণ ছাড়া মালিকবিহীন কোনো প্রাণী নিধন বা অপসারণ করা যাবে না। অর্থাৎ এসব আইন মিলিয়ে দেখা যায়, গাভির যত্নের দায় মালিকের, আর জনসাধারণের জায়গায় ঘুরে বেড়ানো গবাদিপশু আটকের ক্ষমতা স্থানীয় সরকার ও পুলিশের হাতে।
দেশে ও ময়মনসিংহে গবাদিপশু
বাংলাদেশে গবাদিপশু পালন হয় বড় পরিসরে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে গরুর সংখ্যা ছিল ২৫১ দশমিক ৭১ লাখ, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ২৩৭ দশমিক ৮৫ লাখ। একই সময়ে মহিষ ছিল ১৫ দশমিক ৩২ লাখ, ভেড়া ৩৯ দশমিক ৮১ লাখ এবং ছাগল ২৭২ দশমিক ৯১ লাখ। একই প্রকাশনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন ধরা হয়েছে ১৫৫ দশমিক ৩৮ লাখ টন, যেখানে জনপ্রতি দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার হিসাবে চাহিদা ১৬২ দশমিক ৩৩ লাখ টন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যে, স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অবদান ১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

ময়মনসিংহ শহর যে জেলার সদর, সেই ময়মনসিংহ জেলা মূলত কৃষিনির্ভর। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাপিডিয়া জানায়, জেলার আয়তন ৪ হাজার ৮০ দশমিক ১৮ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ৪৮ লাখ ১২ হাজার ৫২ জন, এবং ৬৪ দশমিক ১৪ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। জেলাটি গঠিত হয় ১৭৮৭ সালে; প্রধান নদী পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ভোগাই, বাজুয়া ও কংস। দেশের কৃষি গবেষণা ও শিক্ষার কয়েকটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানও এই জেলায়: ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।
হাসপাতাল ঘিরে থাকা শহর
ময়মনসিংহ শহর পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের তীরে, ঢাকা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার উত্তরে। এটি দেশের আট বিভাগের একটি, ময়মনসিংহ বিভাগের সদর দপ্তর। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায় খানা ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৯৫টি এবং জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৭৭ হাজার। শহরের উত্তর সীমা চিহ্নিত করেছে ব্রহ্মপুত্র নদ, আর অন্য প্রান্তগুলোয় রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, সেনানিবাস ও সুলতানাবাদ।
বিভাগের প্রধান রেফারেল হাসপাতাল হওয়ায় মমেক হাসপাতালে শহরের বাইরে থেকেও বহু রোগী আসেন। এখানে উদ্ধৃত প্রতিবেদনগুলোতেই ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলা ও টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে আসা রোগীদের কথা রয়েছে, আর হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বণিক বার্তাকে বলেছেন, আশপাশের জেলাগুলোতে ভালো হাসপাতালের অভাবে রোগীরা চরপাড়ার এই হাসপাতালেই আসতে থাকেন।

ছবি: Hermitage17 / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বণিক বার্তা (স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন ২০২৩), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, যুগান্তর, দেশ রূপান্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি), বাংলাদেশ আইন (লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)