২০২৬ সালের ২৯ মে, ঈদুল আজহার পরদিন, বরিশাল নগরীর পোর্ট রোডে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাধারণ মানুষ ও মাদরাসার লোকজন। জাগো নিউজ ২৪-এর বরিশাল প্রতিনিধি জানান, ব্যবসায়ীরা একটি গরুর চামড়ার জন্য ৩০০ টাকার বেশি দিতে চাননি, আর খাসির চামড়া একপ্রকার বিনা মূল্যেই দিয়ে দিতে হয়েছে। ন্যায্য দাম না পেয়ে অনেকে চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে ফেলে রেখেই চলে যান।
ঈদুল আজহা ছিল বৃহস্পতিবার, ২৮ মে। সেদিন দুপুরের পর থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্যান, রিকশা ও অটোরিকশায় চামড়া পোর্ট রোডে আসতে শুরু করে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে গত বছরের প্রায় ৮০ শতাংশ টাকা তখনো বকেয়া থাকায় তারাও চরম সংকটে।
সরকারি দর আর বাজারের দামের ফারাক
ঈদের দুই সপ্তাহ আগে, ১৩ মে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ২০২৬ সালের কোরবানির চামড়ার দাম ঘোষণা করেন। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা ধরা হয়। আগের বছর এই দর ছিল ঢাকায় ৬০ থেকে ৬৫ টাকা ও ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। চামড়া সংরক্ষণে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে লবণ সরবরাহ এবং মাংস ব্যবসায়ী ও মাদরাসার লোকজনকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানানো হয়।
নির্ধারিত দর ছিল লবণ দেওয়া চামড়ার প্রতি বর্গফুটের হিসাবে, কিন্তু মাঠে কাঁচা চামড়া বিক্রি হয় গোটা চামড়ার দরে। ঈদের দিন রাজধানীতেও সরকারি দরে চামড়া বিক্রি হয়নি: দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, ঢাকায় কাঁচা চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হয়, যা আগের বছর ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা ছিল।
নগরীর ধান গবেষণা রোডের একটি মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা সোহাগ গাজী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের মাদরাসা থেকে এবার সিদ্ধান্ত ছিল চামড়া সংগ্রহ করা হবে না। পরে বাণিজ্যমন্ত্রীর আশ্বাসে আমরা সংগ্রহে নামি। তিনি বলেছিলেন, প্রতি ফুট গরুর চামড়া ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে এসে দেখি গরুর চামড়া ৩০০ টাকার বেশি দিতে চাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।’

লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের আয়ে টান
কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা অনেক মাদরাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের খরচ চালানোর একটি উৎস। বটতলা এলাকার খাজা লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের কুদরত আলী বলেন, ‘সারাদিন পরিশ্রম করে যদি একটা চামড়া ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়, তাহলে কষ্টের শেষ থাকে না। আমাদের একেকজন ছাত্রের পেছনে ২০০-২৫০ টাকা খরচ হয়। তাহলে বোর্ডিংয়ে আর কী থাকে? গাড়ি ভাড়াও ওঠে না।’
মুসলিম গোরস্থান লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের আবুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দানশীল ব্যক্তিরা আমাদের কাছে চামড়া দিয়ে যান। আমরা আগে থেকেই শুনেছিলাম এবার দাম কম হবে, কিন্তু এত কম হবে বুঝিনি। গরুর চামড়ার সঙ্গে খাসির চামড়া একপ্রকার ফ্রিতেই দিতে হচ্ছে।’

ট্যানারির বকেয়ায় কমছে ব্যবসায়ী
পোর্ট রোডের চামড়া ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নাসির বলেন, ‘গত বছরের মাত্র ২০-২৫ শতাংশ টাকা আমরা পেয়েছি। এ কারণে ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। সাতটা চামড়া এলে একটা রাখি, বাকি ছয়টা ফিরিয়ে দেই। গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় কিনছি, আর ছাগলের চামড়ার কোনো দামই নেই। এসব চামড়া ২০-৩০ দিন পর ঢাকায় পাঠানো হবে।’ তিনি জানান, আগে বরিশালে ১৫০ থেকে ২০০ জন চামড়া ব্যবসায়ী ছিলেন, তখন ছিলেন সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ জন।
ঢাকাতেও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা একই ধরনের অভিযোগ করেন। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা বলেন, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সেই দামে চামড়া কেনার কোনো নিশ্চয়তা তারা পাননি।
কীর্তনখোলায় ধোয়া, রসুলপুরে লবণ
সরেজমিনে দেখা যায়, পোর্ট রোড থেকে সংগ্রহ করা চামড়া বালুরঘাটে নিয়ে কীর্তনখোলা নদীর পানিতে ধোয়া হচ্ছিল। এরপর ট্রলারে করে রসুলপুরে নেওয়া হয়, সেখানে শ্রমিকরা লবণ দিয়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করছিলেন। কীর্তনখোলা বরিশাল নগরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী, এর তীরেই বরিশাল নদীবন্দর।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শ্রমিক আবু বক্কর বলেন, ‘গত চার-পাঁচ বছর ধরেই চামড়ার বাজারের এমন অবস্থা। বছর বছর ব্যবসায়ী কমছে, আমাদের কাজও কমে গেছে। মানুষ অনেক চামড়া নিয়ে আসে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা কিনতে চায় না। তারা কিনেও কী করবে? ট্যানারি মালিকরা তো টাকা দেয় না।’

ছবি: শাহাদাত সায়েম / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)