২০২৪ সালের নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মানিকগঞ্জ জেলায় আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়। মাঠজুড়ে দোল খাচ্ছিল কৃষকের সোনালি ধান। ধান পাকতে শুরু করায় কাটা ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন কৃষক ও শ্রমিকেরা। ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর জেলা থেকে পাঠানো জাগো নিউজের প্রতিবেদনে কৃষকেরা জানান, তাঁরা আশা করছেন চাষের খরচ মিটিয়ে ধারদেনাও শোধ করতে পারবেন।
আমন বাংলাদেশের বর্ষা মৌসুমের ধান। ঢাকার পশ্চিমে পদ্মা ও যমুনাপারের নদীবহুল জেলা মানিকগঞ্জে এই ধান দুইভাবে চাষ হয়: বর্ষার পর পানি নেমে যায় এমন জমিতে রোপা আমন, আর যে জমি পরে বন্যার পানিতে ডুবে থাকে সেখানে সরাসরি বীজ ছিটিয়ে বোনা আমন। ২০২৪ সালের জেলার হিসাবে সেবার বোনা আমনের জমিই ছিল বেশি।
জেলা কৃষি অফিস যা জানিয়েছিল
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ মৌসুমে জেলায় ৩৫ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, আবাদ হয় ৩১ হাজার ৬৪৯ হেক্টর জমিতে। ১০ নভেম্বর পর্যন্ত এর ৩০ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছিল, আর পরের ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কাটা শেষ হবে বলে আশা করছিল কার্যালয়টি। ধান কাটা শেষ হলে কৃষক আমনের ভালো দাম পাবেন বলেও আশা করছিল জেলা কৃষি অফিস।
মানিকগঞ্জে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. রবীআহ নূর আহমেদ চাষের ধরন অনুযায়ী হিসাব দেন। তিনি বলেন, ‘কৃষি অফিসের পরামর্শে গত বছর রোপা আমন চাষ করা হয়েছিল ১১ হাজার ৪৬২ হেক্টর জমিতে। এ বছর চাষ হয়েছে ১২ হাজার ৩৮ হেক্টর জমিতে। বোনা আমন গত বছর চাষ হয়েছিল ১২ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে। এ বছর চাষ হয়েছে ১৯ হাজার ৬১১ হেক্টর জমিতে। আশা করি এ বছর গত বছরের চেয়ে দাম ভালো পাবেন কৃষক।’
২০২৩ সালের রোপা আমনের যে হিসাব তিনি দেন, তা ওই মৌসুমে ডিএইয়ের নিজের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়। ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস মানিকগঞ্জের ডিএইর বরাতে জানায়, সেবার জেলায় ১০ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ এবং ৩৩ হাজার ৭৮৯ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল; কৃষকেরা চাষ করেন ১১ হাজার ৪৬২ হেক্টরে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৪১২ হেক্টর বেশি। তখন সবে ধান কাটা শুরু হয়েছিল, আর ডিএই আশা করছিল জেলার সাতটির মধ্যে পাঁচটি উপজেলায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
কৃষকের কথা: খরচ কম, শ্রমিকের মজুরি বেশি
জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলা কৃষকেরা ভালো ফলনের কারণ হিসেবে আবহাওয়া আর পোকার আক্রমণ না থাকার কথা বলেন। বাঠইমুড়ি গ্রামের মিঠুন আহম্মেদ বলেন, ‘বন্যার পানিও খুব বেশি হয়নি। ধানে কোনো পোকার আক্রমণও হয়নি। ফলে এবার খরচ কমই হয়েছে। তবে ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছিল। তাতে ধান আবাদে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। তাই ধানের ফলনও বাম্পার হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে সব ধান কাটা ও মাড়াই শেষে ঘরে তুলতে পারবো।’
ঘিওর উপজেলার উভাজানী গ্রামের রতন দেওয়ান জানান, তিনি এবার ৫ বিঘা জমিতে আমনের চাষ করেছেন এবং ৪০ মণের কাছাকাছি ধান পাওয়ার আশা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমন ধানে কোনো রকমের সার-কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। তাই খরচ কম হয়। আশা করি লোনের টাকা দিয়েও হাতে কিছু থাকবে।’ এটি তাঁর নিজের জমির অভিজ্ঞতা। বিঘার মাপও সব জায়গায় এক নয়, অঞ্চলভেদে আলাদা। আর ২০২৩ সালের সরকারি প্রণোদনায় মানিকগঞ্জের ডিএই রোপা আমনের জন্য ক্ষুদ্র কৃষকদের বীজের সঙ্গে সারও দিয়েছিল, যা নিচে বলা হয়েছে।
একই গ্রামের রবিউল বলেন, বাজার ভালো মনে হলেও ধান কাটায় মজুরির খরচ বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘শুনেছি এবার বাজারে ধানের দাম ভালো। তবে গতবারের চাইতে এবার ধান কাটার শ্রমিকের দামটা একটু বেশি। প্রতি শ্রমিককে তিনবার খাইয়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দিতে হচ্ছে।’

হাটে ধানের দাম ও সরকারের সংগ্রহ পরিকল্পনা
নতুন আমন ধান তখন সবে স্থানীয় হাটে আসতে শুরু করেছিল। ধান ব্যবসায়ী আলমাস আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ বছর আমন ধান হাটে আসতে শুরু করেছে। আমরা আজ ১১০০ থেকে ১২০০ টাকায় কিনেছি। তবে মনে হচ্ছে আরও দাম বাড়তে পারে।’ এই দাম এক মণ ধানের। দেশের ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা সাধারণত ৪০ কেজিতে এক মণ ধরেন; ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর রংপুর থেকে বাসসের প্রতিবেদনেও এক কৃষকের আগাম আমন ধান মণপ্রতি ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রির কথা বলতে গিয়ে মণকে ৪০ কেজি ধরা হয়।
মানিকগঞ্জের প্রতিবেদনের চার দিন আগে, ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর, নতুন আমন কেনার সরকারি দর ঠিক হয়। সচিবালয়ে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠক শেষে খাদ্য সচিব মো. মাসুদুল হাসান জানান, সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৩ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা এবং আতপ চাল ৪৬ টাকায় কিনবে, যা আগের মৌসুমের চেয়ে কেজিতে ৩ টাকা বেশি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, সাড়ে ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল, সব মিলিয়ে ১০ লাখ টন। ধান ও চাল সংগ্রহ চলবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, আর আতপ চাল ১০ মার্চ পর্যন্ত।
খাদ্য সচিব জানান, আগের বছরের তুলনায় উৎপাদন খরচ কেজিতে দুই থেকে আড়াই টাকা বেড়েছে বিবেচনায় দাম তিন টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। তুলনায়, ২০২৩-২৪ সালের আমন মৌসুমে সরকার কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে ২ লাখ টন ধান, ৪৪ টাকা দরে ৪ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ৪৩ টাকা দরে ১ লাখ টন আতপ চাল কেনার পরিকল্পনা করেছিল।
ফসল ওঠার আগে বাজারে চালের দাম চড়া ছিল। ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট প্রকাশিত গ্রেইন অ্যান্ড ফিড আপডেটে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) দপ্তর ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে মোটা চালের গড় খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫২ টাকা, যা আগের মাসের চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি; তাদের সূত্রগুলো ধারণা করছিল অক্টোবরে আমন কাটা শুরু হওয়া পর্যন্ত চালের দাম বাড়তে থাকবে। ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দ্য ডেইলি স্টার বাংলা টিসিবির তথ্য দিয়ে জানায়, ঢাকায় মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, যা এক বছর আগের চেয়ে ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোনো চাল আমদানি হয়নি।

রোপা আমন আর বোনা আমন
উপপরিচালকের দেওয়া দুই ধরনের হিসাব আসলে একই মৌসুমের দুটি আলাদা ফসলের। রোপা আমনের চারা বীজতলায় তৈরি করে বর্ষায় খেতে রোপণ করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ধানের ফসলগুলোর মধ্যে রোপা আমনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; ২০০৯-১০ সালে দেশের ধানি জমির প্রায় ৪৬ শতাংশে রোপা আমন হয়েছিল, আর বোনা বা ছিটানো আমন হয়েছিল প্রায় ৪ শতাংশে। রোপা আমন দেশের সব অঞ্চলেই চাষ হয়।
বোনা আমন হলো দেশের গভীর পানির ধান। বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায়, যে ধান মৌসুমে এক মাস বা তার বেশি সময় ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি পানিতে জন্মায়, সেটিই গভীর পানির ধান; বর্ষায় দেশের নিচু জমিতে যে ধান হয় তার বেশিরভাগই ভাসমান ধরনের, স্থানীয়ভাবে যা বোনা আমন, জলিধান বা পৌষধান নামে পরিচিত। সাধারণত মার্চ-এপ্রিলে বর্ষার প্রথম বৃষ্টির পর শুকনো জমিতে এর বীজ বোনা হয়, জুন-জুলাইয়ে বন্যা শুরুর আগ পর্যন্ত ফসল বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে, আর জাতভেদে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝির মধ্যে ধান পাকে।
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে গভীর পানির ধানের ২ হাজারের বেশি এবং এশিয়ায় ৬ হাজারের বেশি জাত রয়েছে। এগুলোর প্রায় সবই দিনের দৈর্ঘ্যের প্রতি খুব সংবেদনশীল; এর ফলে বন্যার মৌসুমের অনুকূল সময়ে ফুল আসে এবং সাধারণত বন্যার পানি নামতেই ফসল পেকে যায়। গভীর পানির জাতগুলোর কিছু বিশেষ অভিযোজন আছে। পানি বাড়ার সঙ্গে এরা কাণ্ড লম্বা করতে পারে, পানির নিচে ওপরের গিঁট থেকে শিকড় ও কুশি গজায়, আর বন্যার পানি নামার সময় গাছের মাথা ওপরের দিকে বেঁকে শিষ পানির ওপরে রাখে। বাংলাপিডিয়া জানায়, এই ফসলে খুব সামান্য সার লাগে, আর বন্যার আগে দুবার মই দিয়ে ও হাতে নিড়ানি দিয়ে আগাছা দমন করা হয়। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ২ দশমিক ৩ টন, কোনো কোনো জাতে ৩ টনের বেশি। ষাটের দশকের শেষে দেশে প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে গভীর পানির ধান হতো; শুকনো মৌসুমে সেচনির্ভর উচ্চফলনশীল বোরো এসব জমিতে ছড়িয়ে পড়ায় তা কমে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ হেক্টরে নামে। বাংলাপিডিয়া জানায়, এর ফলে এমন প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি এখন বর্ষায় পতিত থাকে।
রোপা আমনের চিত্র আলাদা। ২০২৩ সালে মানিকগঞ্জ নিয়ে বাসসের প্রতিবেদনে ডিএই জানায়, আমন সাধারণত পলিমাটিতে ভালো হয়, সেখানকার কৃষকেরা বোরো কাটার পর একই জমিতে আমন রোপণ করেন, আর রোপা আমনের চাষিরা মূলত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করেন, কেউ কেউ শ্যালো মেশিনের পানিও ব্যবহার করেন। আমনে খরচ কম লাগার যে কথা কৃষক বলেছেন, তার পটভূমি এটিই: জেলার বোনা আমনের বড় অংশ কেনা উপকরণ কম লাগিয়ে বন্যা ও বৃষ্টির পানিতেই বেড়ে ওঠে।

মানিকগঞ্জ: নদী আর কৃষির জেলা
মানিকগঞ্জ ঢাকা বিভাগের জেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ১,৩৮৩.৬৬ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা সাতটি: ঘিওর, দৌলতপুর, মানিকগঞ্জ সদর, শিবালয়, সাটুরিয়া, সিংগাইর ও হরিরামপুর। উত্তরে টাঙ্গাইল, দক্ষিণে ফরিদপুর ও ঢাকা, পূর্বে ঢাকা আর পশ্চিমে পাবনা, রাজবাড়ী ও সিরাজগঞ্জ জেলা। প্রধান নদী পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, ইছামতী, কালীগঙ্গা ও গাজীখালী। মানিকগঞ্জ মহকুমা হয় ১৮৪৫ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে।
জেলার প্রধান জীবিকা কৃষি। বাংলাপিডিয়ায় উদ্ধৃত ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্যে জেলার আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে কৃষির হার ৫৬.১৫ শতাংশ, আর জনসংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৭। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত দুই কৃষকের উপজেলা ঘিওরের আয়তন ১৪৮.৯২ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৯২। এখানকার নদী ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, ইছামতী ও গাংডুবি, আর উল্লেখযোগ্য জলাভূমি বৈরাগীর বিল। বাংলাপিডিয়ায় ঘিওরের প্রধান ফসল হিসেবে ধান, গম, সরিষা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও সবজির নাম রয়েছে, আর প্রধান রপ্তানিপণ্য পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও সবজি। কৃষিজমির মালিকানার হিসাবে ঘিওরের ৫৯.০৬ শতাংশ মানুষ জমির মালিক, ৪০.৯৪ শতাংশ ভূমিহীন।
বছরজুড়ে ধানের সঙ্গে অন্য ফসলও জেলার জমি ভাগ করে নেয়। ২০২৪ সালের মে মাসে বাসস জানায়, মানিকগঞ্জের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্থকরী ফসল পাট সাতটি উপজেলাতেই ৪ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে বোনা হচ্ছিল, লক্ষ্য ছিল ৬৪ হাজার ৫৮০ বেল; সিংগাইর, মানিকগঞ্জ সদর ও সাটুরিয়ার মাটি পাটের জন্য বিশেষ উপযোগী।

আগের মৌসুমে ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তা
আগের বছরের আমনে মানিকগঞ্জে ডিএই বিনামূল্যে উপকরণ দিয়েছিল। ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বরের বাসস প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আমন মৌসুমে মানিকগঞ্জ সদর, সাটুরিয়া, সিংগাইর, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার ৪ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সরকারি প্রণোদনা পান। তালিকাভুক্ত প্রত্যেক কৃষককে এক বিঘা জমির জন্য ৫ কেজি আমন বীজ এবং ১০ কেজি করে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সার বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
ডিএই তখন জানিয়েছিল, সেই মৌসুমে বর্ষার পানি কম ছিল, আর জেলায় রোপা আমন চাষে বৃষ্টির পানি খুব কাজে এসেছে। তখনকার মানিকগঞ্জ ডিএইর উপপরিচালক আবু মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ ২০২৩ সালের যে লক্ষ্যমাত্রা ও আবাদের হিসাব দেন, তা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্য অঞ্চলে বন্যার মৌসুম
মানিকগঞ্জে ভালো ফলন হলেও দেশের অন্য অঞ্চলে সেবার আমনের বছর কঠিন ছিল। ২০২৪ সালের ৩০ আগস্টের প্রতিবেদনে ঢাকার ইউএসডিএ দপ্তর জানায়, ১৮ থেকে ২১ আগস্টের ভারী বৃষ্টিতে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বন্যা হয়, আর ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে মুহুরী, কহুয়া, সিলোনিয়া ও গোমতী নদী দিয়ে নেমে আসা পানিতে ফেনী, কুমিল্লা ও আশপাশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে আনুমানিক ২ লাখ হেক্টর আমন ধানের ক্ষতি হয়।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণত ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমন রোপণ করা যায়; পানি নেমে গেলে এবং ৩১ আগস্টের মধ্যে বীজতলার জন্য বীজ পেলে বন্যাকবলিত জমির ১০ থেকে ১৫ শতাংশে আবার আমন রোপণ সম্ভব। দেশের জাতীয় ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সূত্র জানায়, বীজের প্রাপ্যতা অনুযায়ী বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকদের সরাসরি বীজ বপন পদ্ধতিতে ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫, বিনা ধান৭ ও বিনা ধান১৭ চাষের পরামর্শ দেওয়া হবে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ব্রি ১৯৭০ সালে ঢাকা থেকে ৩৬ কিলোমিটার দূরে গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়, আর এর জিন ব্যাংকে ধানের প্রায় ৫ হাজার জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত আছে।
মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের চিত্র ছিল ভালো। ইউএসডিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকা অঞ্চলের বেশিরভাগ জেলায় আমন রোপণ শেষ হয়; বীজতলা তৈরি ও রোপণের সময় আগের তিন বছরের চেয়ে বৃষ্টি ভালো হয়েছিল, যদিও কিছু কৃষককে আংশিক সেচ দিতে হয়েছে। ডিএইর ফসল প্রতিবেদনের বরাতে সেখানে বলা হয়, ১০ আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ৬০ শতাংশ আমন রোপণ শেষ হয়েছিল। পরে অক্টোবরে উত্তরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা হয়: ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর বাসস জানায়, রংপুর অঞ্চলের ১৭টি উপজেলায় ১ হাজার ৪১৭ হেক্টর আমন খেত পানিতে তলিয়ে যায়।
দেশের চালের জোগানে আমন
উৎপাদনের দিক থেকে দেশের তিন ধানি ফসলের মধ্যে বোরোর পরই আমনের স্থান। ডিএইর তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার ইউএসডিএ দপ্তর ২০২৩-২৪ সালের আমনের আবাদ ৫৮ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর এবং উৎপাদন ১ কোটি ৪৬ লাখ টন চাল ধরেছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে বন্যার কারণে তারা ২০২৪-২৫ সালের আমনের পূর্বাভাস কমিয়ে ৫৭ লাখ হেক্টর ও ১ কোটি ৪২ লাখ টনে নামায়, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কম; সেই বছরের মোট চাল উৎপাদনের পূর্বাভাস দেয় ৩ কোটি ৬৮ লাখ টন।
আগের মৌসুমগুলোও দেখায় দেশ এই ফসলের ওপর কতটা নির্ভরশীল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃষ্টিস্বল্প ২০২৩ মৌসুমে আগস্টের শেষে ডিএইর মহাপরিচালক জানান, সে বছর ১ কোটি ৬৫ লাখ টন আমন চাল উৎপাদনের আশা করছে অধিদপ্তর, যেখানে আগের বছর উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৬৩ লাখ টন। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য দিয়ে জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩ কোটি ৯১ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়, যা টানা ষষ্ঠ বছরের প্রবৃদ্ধি; সে বছর ধানি জমির ৮১ শতাংশে উচ্চফলনশীল জাত, ১০ শতাংশে হাইব্রিড আর ৯ শতাংশে স্থানীয় জাতের চাষ হয়।
ইউএসডিএর আগস্ট ২০২৪ প্রতিবেদনে ধানের স্বাভাবিক মৌসুম-পঞ্জিও দেওয়া আছে। বোরো রোপণ হয় ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে, কাটা হয় এপ্রিল-মেতে; আউশ রোপণ হয় এপ্রিল-মেতে, কাটা হয় আগস্ট-সেপ্টেম্বরে; আর আমন রোপণ হয় আগস্ট-সেপ্টেম্বরে, কাটা শেষ হয় নভেম্বর-ডিসেম্বরে। তবে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় দেশের নানা অঞ্চলে এই মৌসুমগুলো পিছিয়ে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নভেম্বরের শুরুতে মানিকগঞ্জের কৃষকেরা যখন ধান কাটছিলেন এবং বেশিরভাগ ধান তখনো মাঠে, তখন তাঁরা ছিলেন সেই কাটার মৌসুমের মধ্যেই।
ছবি: সৈয়দ তৌহিদ হাসান / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের বৈদেশিক কৃষি সেবা (গ্রেইন অ্যান্ড ফিড আপডেট, ৩০ আগস্ট ২০২৪), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)