২০২৬ সালের ১৮ মার্চ, রমজান মাসে, অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক কলার লাচ্ছির একটি ছোট রেসিপি প্রকাশ করে। পাকা কলা, মিষ্টি দই, মধু আর এক চিমটি এলাচগুঁড়া একসঙ্গে ব্লেন্ড করে তৈরি হয় এই ঠান্ডা পানীয়। পত্রিকাটি একে গরমের দিনের সহজ পানীয় হিসেবে তুলে ধরে, যা কয়েক মিনিটেই বানানো যায় এবং যার উপকরণ সাধারণত ঘরেই থাকে; আর পরামর্শ দেয় ইফতারে, অর্থাৎ দিনের রোজা ভাঙার খাবারে, পরিবার নিয়ে উপভোগ করার। এই প্রতিবেদনে রেসিপিটি যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল সেভাবেই তুলে ধরা হলো, সঙ্গে সে সময় পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি ও তথ্যসূত্রভিত্তিক উৎস থেকে জানানো হলো গ্লাসের ভেতরে কী থাকে: লাচ্ছির ঐতিহ্য, বাংলাদেশের কলা, মিষ্টি দই, মধু ও এলাচের পরিচয়, আর পুষ্টি, চিনি ও নিরাপদে বানানো নিয়ে খাদ্য ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ।
জাগো নিউজের প্রকাশিত রেসিপি
রেসিপিতে উপকরণ পাঁচটি। নিচের পরিমাণগুলো পত্রিকাটির ছাপা পরিমাণই, শুধু একটি সংশোধন করা হয়েছে। মূল উপকরণ তালিকায় ঠান্ডা পানির পরিমাণ লেখা ছিল "২৫০ লিটার", যা দুটি কলা আর ১৫০ গ্রাম দইয়ের একটি রেসিপিতে স্পষ্টতই মুদ্রণের ভুল; এখানে তা ২৫০ মিলিলিটার লেখা হলো। প্রণালিতেই বলা আছে পানি দিতে হবে "পরিমাণমতো", তাই স্বাদ অনুযায়ী পানির পরিমাণ কমবেশি করা যায়।
- ঠান্ডা পানি: ২৫০ মিলিলিটার (মূল প্রতিবেদনে "২৫০ লিটার" ছাপা হয়েছিল)
- মিষ্টি দই: ১৫০ গ্রাম
- পাকা কলা: ২টি
- মধু: ২ চামচ
- এলাচগুঁড়া: ১ চিমটি
প্রকাশিত প্রণালিতে ধাপ দুটি:
- পানি ছাড়া সব উপকরণ একসঙ্গে ব্লেন্ডারে দিয়ে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে নিন।
- এবার পরিমাণমতো পানি দিয়ে আরও একবার ব্লেন্ড করুন। ব্যস, কলার লাচ্ছি পরিবেশনের জন্য তৈরি।
পানি সবার শেষে দেওয়া হয় বলে লাচ্ছি কতটা ঘন হবে তা রাঁধুনির হাতেই থাকে: অল্প পানিতে পানীয়টি স্মুদির কাছাকাছি ঘন হয়, বেশি পানিতে হয় পাতলা। রেসিপিতে কলার জাত বা চামচের মাপ উল্লেখ নেই, কতজনের জন্য তাও বলা হয়নি। জাগো নিউজ লাচ্ছিটিকে স্বাদে মিষ্টি, ঘন ও তৃপ্তিদায়ক বলে বর্ণনা করে এবং ইফতারের টেবিলের পানীয় হিসেবে প্রস্তাব করে।
সেই মাসে পত্রিকাটির লাইফস্টাইল ডেস্ক রমজানের পানীয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি রেসিপি প্রকাশ করেছিল, কলার লাচ্ছি তারই একটি। একই পাতায় বাঙ্গির শরবত, লাবান, জিরা পানির শরবত, পাকা পেঁপের লাচ্ছি এবং লেমন স্ট্রবেরি জুসের রেসিপির লিংক ছিল; সবগুলোই রোজা ভাঙার পানীয় হিসেবে উপস্থাপিত।

লাচ্ছি কী, এল কোথা থেকে
লাচ্ছি দইভিত্তিক একটি পানীয়, ঘনত্বে অনেকটা স্মুদির মতো। তথ্যকোষগুলো এর উৎস হিসেবে পাঞ্জাবের কথা বলে, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে মহিষের দুধের দই দিয়ে লাচ্ছি বানানো হতো এবং পরিবেশন করা হতো কুলহার নামের মাটির ভাঁড়ে; এখন বিশ্বের নানা অঞ্চলে এটি পান করা হয়। মূল পানীয়টি হলো দই, পানি ও মসলা একসঙ্গে ব্লেন্ড করা। নোনতা লাচ্ছিতে, যাকে নমকিন লাচ্ছি বলা হয়, লবণ, গোলমরিচ ও জিরা যোগ হয়; আর মিষ্টি লাচ্ছি বা মিঠি লাচ্ছিতে সুগন্ধ আনা হয় এলাচ, গোলাপজল বা জাফরান দিয়ে। ফল যোগ করাও প্রচলিত, যেমন আমের লাচ্ছি বা স্ট্রবেরি লাচ্ছি। কলার লাচ্ছি এই মিষ্টি ফলের লাচ্ছিরই একটি ধরন, আর এর এক চিমটি এলাচ মিষ্টি লাচ্ছির ঐতিহ্যই অনুসরণ করে।
বাংলাদেশে দই আর ফল একসঙ্গে খাওয়ার পুরোনো অভ্যাসের সঙ্গে পানীয়টি মিলে যায়। দেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, গ্রামের অনেক পরিবারে দিনের শুরু হয় মুড়ি, চিড়া বা খই দিয়ে, যা খাওয়া হয় দুধ বা দই আর আম, কলা বা কাঁঠালের মতো মৌসুমি ফলের সঙ্গে। বাংলাপিডিয়া আরও উল্লেখ করেছে, আনুষ্ঠানিক বা উৎসবের ভোজে প্রায়ই শেষ পদ হিসেবে পরিবেশন করা হয় মিষ্টি দই। কলার লাচ্ছি এই দুই চেনা খাবার, পাকা কলা আর মিষ্টি দই, এক গ্লাসে নিয়ে আসে।
কলা: সারা বছর ফলে যে ফল
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় কলা একটি পরিচিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল, যা দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালের দিকে ভারতে ছড়িয়ে পড়ে, এবং সম্ভবত এটিই পৃথিবীর প্রাচীনতম চাষ করা ফসল। কলাগাছ সবচেয়ে উঁচু বীরুৎ উদ্ভিদগুলোর একটি। যাকে কাণ্ড মনে হয় তা আসলে পাতার খোল পরস্পর জড়িয়ে তৈরি ছদ্মকাণ্ড, আর পাতা ৩৬৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। প্রতিটি গাছে একটিমাত্র ঝুলন্ত পুষ্পমঞ্জরি হয়, যার নিচের দিকে স্ত্রী ফুল ও ওপরের দিকে পুরুষ ফুল থাকে; স্ত্রী ফুল থেকেই হয় চেনা কলার কাঁদি। একটি কাঁদিতে পাঁচ থেকে পনেরোটি ছড়া বা ফানা থাকে, প্রতিটি ছড়ায় ছয় থেকে বিশটি কলা। চাষের কলায় বীজ থাকে না। একবার ফল দেওয়ার পর গাছটি মরে যায় বা কেটে ফেলা হয়, আর মাটির নিচের রাইজোম থেকে গজানো চারা বা তেউড় থেকে হয় পরের গাছ।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় সারা বছর কলা জন্মায়; প্রধান কলা উৎপাদনকারী এলাকা রাঙামাটি, বরিশাল, রংপুর, দিনাজপুর, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও খুলনা। জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে আছে সাগর, চাঁপা, সবরি, সিঙ্গাপুরি ও মেহেরসাগর। তরকারি হিসেবে রান্না করা কাঁচকলা পাকা খাওয়ার কলা থেকে আলাদা একটি উপপ্রজাতি, আর বীজযুক্ত আইটা কলাও দেশে জন্মায়। লাচ্ছির জন্য দরকার পাকা খাওয়ার কলা।
বাংলাপিডিয়ায় ২০০৫-০৬ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৬০ একর জমিতে ৯ লাখ ৯ হাজার ৬০ মেট্রিক টন কলা উৎপাদনের হিসাব রয়েছে। আরও সাম্প্রতিক বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জানায়, ২০২৪ অর্থবছরে পাকা কলার উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ১৩ হাজার ৫৬০ টন, যা ২০২৫ অর্থবছরে বেড়ে হয় ৮ লাখ ৬২ হাজার ৬৯২ টন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ অর্থবছরে আমের উৎপাদন ১৮ লাখ ৯০ হাজার টন থেকে কমে ১৮ লাখ ৭০ হাজার টন হয়, কাঁঠাল উৎপাদন ছিল প্রায় ১০ লাখ ২০ হাজার টন, আর আপেল ও কমলার মতো প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টন ফল আমদানিতে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।
ফসলটির সমস্যাও আছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, মাটিবাহিত ছত্রাক ফিউজেরিয়াম অক্সিস্পোরাম এফ. এসপি. কিউবেন্সের কারণে হওয়া পানামা রোগ বা ঢলে পড়া রোগ বাংলাদেশে ব্যাপক ও ক্ষতিকর। আরও আছে গুচ্ছমাথা বা বাঞ্চি টপ, একটি ভাইরাস রোগ যা ছড়ায় কলার জাবপোকা পেন্টালোনিয়া নাইগ্রোনারভোসার মাধ্যমে; ব্যাকটেরিয়াজনিত ঢলে পড়া রোগ; এবং অ্যানথ্রাকনোজ, ফলের একটি ছত্রাক রোগ যাতে পাকার সময় কলার গায়ে কালো দাগ পড়ে। কলার পাতা ও ফলের বিটলের মতো পোকা খোসায় দাগ ফেলে ফলের বাজারমূল্য কমিয়ে দেয়। বাগানে এ ধরনের সমস্যা দেখলে চাষিরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।

মিষ্টি দই ও দেশের দুগ্ধ খামার
দ্বিতীয় উপকরণ মিষ্টি দই। বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে, উত্তর ভারত ও পাকিস্তানের মিষ্টি যেখানে মূলত ঘন দুধ বা ক্ষীর দিয়ে তৈরি, বাঙালির মিষ্টি সেখানে প্রধানত ছানা বা জমাট দুধ থেকে তৈরি। বগুড়ার দইকে বাংলাপিডিয়া বিশেষভাবে সমৃদ্ধ ও মিষ্টি দই হিসেবে উল্লেখ করেছে। আগে শুষ্ক মৌসুমে উত্তরবঙ্গের চারণভূমিতে গরু ও মহিষের বড় বড় অস্থায়ী আস্তানা তৈরি হতো, যাকে বলা হতো বাথান; এসব বাথান ঘিরেই গড়ে ওঠে দইয়ের ব্যবসা। কৃষকেরা দুধ জ্বাল দিয়ে মূল পরিমাণের এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে আনতেন, আর সে কারণেই বগুড়ার দই প্রায় ক্ষীরের মতো ঘন।
২০২৩ সালে বগুড়ার দই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের ৫ জুলাই জানায়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর ২৫ জুন বগুড়ার দই, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আম এবং শেরপুরের সুগন্ধি তুলসীমালা ধানকে জিআই সনদ দেয়; এতে দেশের জিআই পণ্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫টিতে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের দইয়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় ছোট-বড় প্রায় ৪০০ কারখানায় দিনে প্রায় ৫০ টন দই তৈরি হতো। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের জুনে জানায়, জেলায় প্রায় ৫০০টি দইয়ের দোকান চলছে এবং বগুড়ার ১২টি উপজেলায় দিনে ১৯ লাখ লিটারের বেশি দুধ উৎপাদিত হয়, যার বেশির ভাগ যায় দই তৈরিতে।
প্রতিটি দইয়ের হাঁড়ির পেছনে আছে দেশের গবাদিপশুর খামারের দুধ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের "লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫" বিবিএসের সাময়িক হিসাবের ভিত্তিতে জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন ছিল ১৫৫.৩৮ লাখ মেট্রিক টন, যা ২০২৩-২৪ সালে ছিল ১৫০.৪৪ লাখ টন এবং ২০২২-২৩ সালে ১৪০.৬৮ লাখ টন। জনপ্রতি দিনে ২৫০ মিলিলিটার ধরে চাহিদা ছিল ১৬২.৩৩ লাখ টন, আর প্রাপ্যতা দাঁড়ায় জনপ্রতি দিনে ২৩৯.২৯ মিলিলিটার। একই সারণিতে দেশে ২৫১.৭১ লাখ গরু, ১৫.৩২ লাখ মহিষ ও ২৭২.৯১ লাখ ছাগলের হিসাব রয়েছে।
রেসিপিতে চাওয়া হয়েছে মিষ্টি দই, যা নাম থেকেই বোঝা যায় ব্লেন্ডারে যাওয়ার আগেই মিষ্টি করা থাকে। তার সঙ্গে দুই চামচ মধু আর দুটি পাকা কলা মিলে কলার লাচ্ছি বেশ মিষ্টি পানীয়, যা নিচের চিনি-সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মধু: দেশের মধু কোথা থেকে আসে, শিশুদের কেন নয়
বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায় মধু হলো ফুলের মকরন্দ থেকে মৌমাছির তৈরি মিষ্টি, ঘন তরল, যা তারা খাবার হিসেবে চাকে জমিয়ে রাখে। এর প্রধান শর্করা ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ, আর মৌমাছি কোন ফুল থেকে মকরন্দ নেয় তার ওপর নির্ভর করে মধুর রং, স্বাদ ও গন্ধ। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মৌমাছি দুটি প্রজাতির: বড় মৌমাছি বা পাহাড়ি মৌমাছি অ্যাপিস ডরসাটা, যা কখনো পোষ মানেনি কিন্তু বনে দেশের বেশির ভাগ মধু উৎপাদন করে, এবং অ্যাপিস সেরানা ইন্ডিকা, যা বনে ও বাক্সে দুই জায়গাতেই পাওয়া যায়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিমের ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন থেকে আসে দেশের মধুর প্রায় ২০ শতাংশ, যার বেশির ভাগ গরান, গোলপাতা ও খলিশা ফুলের একক-উৎসের মধু। অন্যান্য অঞ্চলে সরিষা, আম ও কুল মধুর গুরুত্বপূর্ণ উৎস, আর সরিষার মধুই দেশে সবচেয়ে পরিচিত। বেশির ভাগ মধু সংগ্রহ হয় ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে, সবচেয়ে বেশি ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলে, অর্থাৎ যে মৌসুমে এই রেসিপি প্রকাশিত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপজেলা পর্যায়ে মৌমাছি পালনের প্রশিক্ষণ দেয় এবং প্রশিক্ষণার্থীদের মৌবাক্স সরবরাহ করে; বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব এপিকালচারও মৌচাষিদের প্রশিক্ষণ দেয়, শীতে সরিষা চাষের এলাকায় মৌবাক্স সরিয়ে নিয়ে মধু সংগ্রহের প্রশিক্ষণসহ। মৌমাছি ৬০টির বেশি কৃষি ফসলের পরাগায়নও ঘটায়।
শিশুদের জন্য মধু নয়। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ পর্যালোচিত নির্দেশনায় বলেছে, শিশুর বয়স এক বছর পার না হওয়া পর্যন্ত তাকে মধু দেবেন না। এনএইচএসের ব্যাখ্যা, মধুতে কখনো কখনো এমন ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে যা শিশুর অন্ত্রে বিষ তৈরি করে ইনফ্যান্ট বটুলিজম রোগ ঘটায়; সংস্থাটি আরও বলেছে, মধুও এক ধরনের চিনি, তাই মধু এড়িয়ে চললে দাঁতের ক্ষয় রোধেও সাহায্য হয়। তাই মধু দিয়ে মিষ্টি করা লাচ্ছি এক বছরের কম বয়সী শিশুকে দেওয়া উচিত নয়।
এলাচ: এক চিমটি মসলা
রেসিপির এলাচ হলো সবুজ বা ছোট এলাচ, বৈজ্ঞানিক নাম ইলেটারিয়া কার্ডামোমাম; এটি আদা পরিবারের (জিঞ্জিবারেসি) একটি বহুবর্ষজীবী বীরুৎ, যার আদি নিবাস দক্ষিণ ভারত। এর সবুজ বীজশুঁটি শুকিয়ে নেওয়া হয়, আর রান্নায় ব্যবহার হয় শুঁটির ভেতরের দানা। ভারতে চাষের এলাকা ও উৎপাদন দুই দিকেই এগিয়ে সিকিম ও কেরালা রাজ্য; নেপাল, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও মধ্য আমেরিকাতেও এর চাষ হয়। এলাচগুঁড়া বহু তরকারি ও মসলা চায়ের স্বাদ গড়ে তোলে, আর ইরান ও ভারতে কফি ও চায়েও এলাচ দেওয়া হয়।
বাংলাপিডিয়া এলাচকে বীজ থেকে পাওয়া মসলার তালিকায় রেখেছে এবং জানিয়েছে, বিশেষ মাংসের তরকারি ও পোলাও-জাতীয় খাবারে ব্যবহৃত গরম মসলা হলো লবঙ্গ, গোলমরিচ, দারুচিনি ও এলাচের মিশ্রণ। বাঙালি ময়রারাও মিষ্টির স্বাদ ও সাজের জন্য তেজপাতা, কিশমিশ, কাজুবাদাম ও কমলার খোসার সঙ্গে এলাচগুঁড়া ব্যবহার করেন। এই লাচ্ছিতে পানীয়টিকে সুগন্ধি করতে এক চিমটিই যথেষ্ট।

উপকরণগুলোতে কী আছে
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল ডেটাবেস প্রতিটি প্রধান উপকরণের প্রতি ১০০ গ্রামের পুষ্টিমান দেয়। পুরো রেসিপিটি সেখানে বিশ্লেষণ করা হয়নি, তাই নিচের হিসাব উপকরণ ধরে ধরে।
- কাঁচা পাকা কলা, প্রতি ১০০ গ্রামে: ৮৯ কিলোক্যালরি, ৭৪.৯ গ্রাম পানি, ১.০৯ গ্রাম প্রোটিন, ০.৩৩ গ্রাম চর্বি এবং ২২.৮ গ্রাম শর্করা, যার মধ্যে ১২.২ গ্রাম চিনি ও ২.৬ গ্রাম খাদ্য-আঁশ; ৩৫৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ২৭ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম, ৮.৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ও ০.৩৬৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি৬।
- ননিযুক্ত দুধের সাধারণ (চিনি ছাড়া) দই, প্রতি ১০০ গ্রামে: ৬১ কিলোক্যালরি, ৮৭.৯ গ্রাম পানি, ৩.৪৭ গ্রাম প্রোটিন, ৩.২৫ গ্রাম চর্বি, ৪.৬৬ গ্রাম শর্করা, ১২১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও ০.৩৭ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি১২।
- মধু, প্রতি ১০০ গ্রামে: ৩০৪ কিলোক্যালরি, ১৭.১ গ্রাম পানি, ০.৩ গ্রাম প্রোটিন এবং ৮২.৪ গ্রাম শর্করা, যার মধ্যে ৮২.১ গ্রাম চিনি, প্রধানত ফ্রুক্টোজ (৪০.৯ গ্রাম) ও গ্লুকোজ (৩৫.৮ গ্রাম)।
দইয়ের এই হিসাব চিনি ছাড়া সাধারণ দইয়ের। মিষ্টি দই তৈরির সময় চিনি মেশানো হয়, তাই এর চিনি ও ক্যালরি এখানে দেখানো সাধারণ দইয়ের চেয়ে বেশি, এবং এক প্রস্তুতকারক থেকে আরেক প্রস্তুতকারকে তা আলাদা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসবিষয়ক ফ্যাক্টশিট, ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারির সংস্করণে, "ফ্রি সুগার" বা মুক্ত চিনির সংজ্ঞায় খাবার ও পানীয়তে যোগ করা চিনির পাশাপাশি মধু, সিরাপ, ফলের রস ও ঘন ফলের রসে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনিকেও ধরেছে। সংস্থাটির পরামর্শ, মুক্ত চিনি দৈনিক মোট শক্তি গ্রহণের ১০ শতাংশের কম রাখতে হবে; স্বাস্থ্যকর ওজনের যে মানুষ দিনে প্রায় ২,০০০ কিলোক্যালরি খান, তাঁর জন্য এটি প্রায় ৫০ গ্রাম বা প্রায় ১২ সমান চা-চামচ। ডব্লিউএইচও আরও বলেছে, এটি ৫ শতাংশ বা তার নিচে নামালে বাড়তি উপকার মিলতে পারে। এই রেসিপিতে মধু আর মিষ্টি দইয়ের চিনি মুক্ত চিনির মধ্যে পড়ে; আস্ত কলার ভেতরের চিনি পড়ে না। একই ফ্যাক্টশিটে ১০ বছরের বেশি বয়সী সবাইকে দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যাঁদের ডায়াবেটিস আছে বা অন্য কোনো কারণে বিশেষ খাদ্যতালিকা মেনে চলতে হয়, তাঁরা ইফতারে এমন মিষ্টি পানীয় যোগ করার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
ঘরে নিরাপদে বানানো
লাচ্ছি কখনো রান্না করা হয় না, তাই বেশির ভাগ ইফতার পদের চেয়ে এখানে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার "নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি", খাদ্য-স্বাস্থ্যবিধির একটি বার্তা যার পোস্টার সংস্থাটির ভাষ্যে ৮৭টির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, পাঁচটি নিয়ম দেয়:
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন।
- কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন।
- ভালোভাবে রান্না করুন।
- খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন।
- নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন।
ব্লেন্ড করা পানীয়ের ক্ষেত্রে প্রথম, চতুর্থ ও পঞ্চম চাবিকাঠি সবচেয়ে সরাসরি প্রযোজ্য। হাত, ব্লেন্ডারের জার ও গ্লাস পরিষ্কার থাকা চাই; দই দ্রুত নষ্ট হওয়া দুগ্ধজাত খাবার; আর এই রেসিপির ঠান্ডা পানি যেহেতু না ফুটিয়েই গ্লাসে যায়, তাই তা হতে হবে নিরাপদ খাওয়ার পানি।
ছবি: Gaurav Dhwaj Khadka / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৮ মার্চ ২০২৬), বাংলাপিডিয়া (কলা, মিষ্টান্ন, খাদ্যাভ্যাস, মধু, মৌমাছি পালন, মসলা), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (ডিসেম্বর ২০২৫ ও জুন ২০২৫), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (৫ জুলাই ২০২৩), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫), যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, লাচ্ছি ও সবুজ এলাচবিষয়ক তথ্যকোষ।





মন্তব্য
(০)