টাঙ্গাইলের এক তরুণ নারী খামারির প্রায় ১০ বছর ধরে লালন-পালন করা সাদা-কালো রঙের বিশাল ষাঁড় ‘মানিক’ ২০২৬ সালের মে মাসে, ঈদুল আজহার কয়েক দিন আগে বিক্রি হয়েছে। মালিকের হিসাবে ষাঁড়টির ওজন প্রায় ৫৬ মণ। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ভেঙ্গুলার গ্রামের খামারি হামিদা আক্তার (২৯) জাগো নিউজকে জানান, পরপর দুই বছর দুজন ক্রেতা বেশি দাম মিটিয়েও আর ফিরে না আসায় শেষ পর্যন্ত তিনি ষাঁড়টি ১১ লাখ ২০ হাজার টাকায় কুষ্টিয়ার কুমারখালীর আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের কাছে বিক্রি করেছেন। ২০২৬ সালের ২৭ মে, বুধবার সকালে পত্রিকাটির কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ফাউন্ডেশনের খামারে গিয়ে দেখেন, টিনশেডের পাকা ঘরে রাখা হয়েছে মানিককে, মাথার ওপরে ঘুরছে ফ্যান। খামারের লোকজন জানান, ঈদের তৃতীয় দিন ষাঁড়টি জবাই করে রান্না করা মাংস এতিম, দুস্থ ও অসহায়দের খাওয়ানো হবে।
দুই ঈদে দুই ক্রেতা, কেউ ফেরেননি
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামিদা আক্তার পরম মমতায় সন্তানের মতো করে ষাঁড়টি লালন-পালন করেছেন এবং শখ করে এর নাম রেখেছেন মানিক। তাঁর প্রত্যাশা ছিল ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় কাঙ্ক্ষিত দামে গরুটি বিক্রি করবেন। সেবার একজন ১৫ লাখ টাকা দাম বলেছিলেন, কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি, ফলে গরুটি বিক্রি হয়নি।
এরপর অনেক কষ্টে ধারদেনা করে তিনি মানিককে আরও এক বছর পালন করেন, ইচ্ছা ছিল ২০২৬ সালের ঈদে বিক্রি করবেন। এবারও একজন ক্রেতা ১৮ লাখ টাকা দাম মিটিয়ে চলে যান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঈদ ঘনিয়ে এলেও সেই ক্রেতাও আর ফেরেননি। প্রতিবেদনের ভাষায়, ভালোবাসার মানিক এভাবে হামিদার জীবনের সবচেয়ে বড় ‘গলার কাঁটা’ হয়ে ওঠে।
জাগো নিউজের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি আরও লিখেছেন, বিশালদেহী গরুটির ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে লাইক, ভিউ ও আয় করেছেন, কিন্তু ক্যামেরার পেছনের খামারির কঠিন দিনে কেউ তাঁর পাশে দাঁড়াননি।
প্রায় ১৩ মিনিটের আলাপে হামিদা আক্তার নিজের মনে রাখা হিসাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুই বছর আগে ষাঁড়টির ওজন ছিল দুই হাজার ৮০ কেজি; বর্তমান ওজন তাঁর জানা নেই। তাঁর ইচ্ছা ছিল ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করার। তাঁর কথায়, ‘গতবছর একজন ১৫ লাখ আর এবছর একজন ১৮ লাখ টাকা দাম মিটিয়ে চলে গিয়ে আর ফেরেননি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বড় গরু কেনার লোক নেই। আবার আরেক বছর পালন করার টাকাও নেই। তাই ১১ লাখ ২০ হাজার টাকায় একজন ভালো মানুষের কাছে বিক্রি করেছি। এতেই খুশি।’
তিনি জানান, সবসময় তাঁর ইচ্ছা ছিল ভালো কোনো মানুষ পেলে তাঁর কাছেই মানিককে বিক্রি করবেন, দুই টাকা লাভ-লোকসান হলেও কোনো ব্যাপারী বা কসাইয়ের কাছে বেচবেন না। তাঁর কথায়, ‘আমার এতটুকুই লাভ হয়েছে যে আমি কিছু ঋণ শোধ করতে পারছি। তারপরও আলহামদুলিল্লাহ। ভালো লোকের কাছে বিক্রি করতে পেরে আমি খুব খুশি।’
দশ বছরের খাবার, খরচ আর ঋণ
হামিদা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, যে দাম পেয়েছেন তাতে খাবারের পেছনে করা খরচের অর্ধেকও ওঠেনি; কষ্ট, পরিশ্রম আর রাতজাগার কথা তো বাদই। তিনি মানিকের প্রতিদিনের খাবারের যে বিবরণ দেন, তা এমন:
- প্রতিদিন ১০ হালি (৪০টি) বিচি কলা;
- প্রতিদিন চার কেজি বুট (ছোলা);
- যতটুকু খেতে পারে ততটুকু ভুসি;
- এক কেজি আতপ চালের ভাত।
তিনি জানান, গরুটি পালতে অনেক টাকা ধারদেনা করতে হয়েছে, বিক্রির টাকায় তার একাংশ শোধ করেছেন। তাঁর হিসাবে বিক্রির পরও চার লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ রয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে তাঁর পারিবারিক অবস্থাও উঠে আসে। ২০২৪ সালে স্নাতক পড়ার সময় তাঁর মা মারা যান। এখন পরিবারে আছেন ছোট বোন আর বৃদ্ধ বাবা। প্রতিবেদনের সময় তিনি স্নাতকোত্তরে পড়ছিলেন এবং একটি বিকাশের দোকান চালানোর পাশাপাশি বাড়ির খামার দেখাশোনা করছিলেন। তিনি জানান, খামারে আরও ১০টি গরু আছে।
হামিদা আক্তার বলেন, ‘ইচ্ছা একটা খামার করবো। আর লাভের টাকায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবো। ১৫ লাখ চাইছিলাম। তবে ক্রেতা পাবো না বলে এই দামে বিক্রি করেছি। তবুও আলহামদুলিল্লাহ। দোয়া করবেন। খামারে আরও ১০টি গরু আছে। এখানে যেন ভালো লাভ হয়।’ ওজন, দুই ক্রেতার দাম, বিক্রয়মূল্য ও ঋণের এই হিসাবগুলো খামারির নিজের দেওয়া; প্রতিবেদনে এগুলো আলাদাভাবে যাচাইয়ের কথা নেই।
কুমারখালীর ফাউন্ডেশনের খামারে মানিক
ষাঁড়টি কিনেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাসিন্দা আলাউদ্দিন আহমেদের প্রতিষ্ঠিত আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন। সোমবার, ২৫ মে মানিককে টাঙ্গাইল থেকে আনা হয় এবং কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিন নগরে ফাউন্ডেশনের খামারে রাখা হয়। বুধবারের সেই সকালে উৎসুক কেউ কেউ গরুটি দেখতে এসেছিলেন।
খামারটির কর্মচারী রেহেনা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিশাল দেহের গরু মানিককে সোমবার (২৫ মে) টাঙ্গাইল থেকে আনা হয়েছে। তাকে উন্নতমানের খাবার দিয়ে যত্ন করা হচ্ছে। ঈদের পর রান্না করে এতিমদের খাওয়ানো হবে।’
ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম জানান, অনলাইনে নারী উদ্যোক্তা হামিদার অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ পেলে আলাউদ্দিন আহমেদ, যাঁকে তিনি দানবীর বলে উল্লেখ করেন, এগিয়ে আসেন। তাঁর কথায়, ‘বছরের পর বছর বুকে পাথর চেপে রাখা যে মানুষগুলোর পাতে এক টুকরো ভালো খাবার জোটেনি, সেই মলিন মুখগুলোতে একটুখানি পরম তৃপ্তির হাসি ফোটাতে ঈদের তৃতীয় দিন গরুটিকে রান্না করে খাওয়ানো হবে।’

৫৬ মণ মানে কত
মণ দক্ষিণ এশিয়ার ওজনের একটি প্রচলিত একক, বাংলাদেশে গরু, ধান ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের ওজনে এখনো এটি ব্যবহৃত হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৩৩ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে প্রথম মণকে ১০০ ট্রয় পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় ৮২.২৮ পাউন্ড (অ্যাভোয়ারডুপোয়া) হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং এক মণকে ৪০ সেরে ভাগ করা হয়। স্বাধীনতার পর এককটিকে মেট্রিক সংজ্ঞা দেওয়া হয়; বাংলাদেশে সারা দেশে এক মণ ধরা হয় ৪০ কেজি। হাটের খবরে বড় গরুর ওজন সাধারণত মণে এমন আনুমানিক হিসাবেই বলা হয়; মানিকের ক্ষেত্রে হামিদা আক্তারের দেওয়া একমাত্র মাপা ওজন হলো দুই বছর আগের দুই হাজার ৮০ কেজি।
এত বড় ষাঁড় দেশের সাধারণ গরুর তুলনায় অনেক বড়। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশের বেশির ভাগ গরু নির্দিষ্ট জাতহীন দেশি জেবু ধরনের। স্বীকৃত দেশি ধরনগুলোর মধ্যে আছে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ এলাকার পাবনা গরু, রেড চিটাগং বা লাল চট্টগ্রামী গরু, সাদা মুন্সীগঞ্জ এবং নর্থ বেঙ্গল গ্রে। দেশি গরুর উন্নয়নে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান ও শাহিওয়ালের মতো বিদেশি জাত আনা হয় এবং মূলত দুধের জন্য দেশি গরুর সঙ্গে সংকরায়ন করা হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে মানিকের জাতের উল্লেখ নেই, তাই এখানেও জাত বলা হলো না।
বাংলাদেশে গরুর ব্যবহার বহুমুখী। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় আছে হালচাষ ও গাড়ি টানা, দুধ ও মাংস, সার, জ্বালানি ও বায়োগ্যাসের উপাদান হিসেবে গোবর, এবং পোশাক, ব্যাগ ও জুতার জন্য চামড়া। অনেক ছোট খামারির কাছে ঈদুল আজহার হাটই বছরের সবচেয়ে বড় সুযোগ, যখন বড় করে তোলা পশুটি বিক্রি করা যায়।
মানিকের খাবার: কলা, বুট আর ভুসি
হামিদা আক্তার যেসব খাবারের কথা বলেছেন, সবই গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফরাসি গবেষণা সংস্থা আইএনআরএই, সিরাড, এএফজেড এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) পরিচালিত পশুখাদ্যের তথ্যভান্ডার ফিডিপিডিয়া এগুলোর প্রতিটির বিবরণ দিয়েছে।
ফিডিপিডিয়ার তথ্যপত্র অনুযায়ী, কলা রোমন্থক প্রাণীর জন্য শক্তির উপযুক্ত উৎস, এর নিট শক্তিমান বার্লির কাছাকাছি; তবে কলায় অপরিশোধিত আমিষ কম (শুষ্ক পদার্থের প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ), আঁশ ও খনিজও কম। এ কারণে ফিডিপিডিয়া বলছে, কলার সঙ্গে ঘাস বা অন্য আঁশজাতীয় খাবার, আমিষের সম্পূরক ও খনিজ মিশ্রণ দেওয়া উচিত। একটি পুরোনো সূত্র উদ্ধৃত করে তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, গরুর খাদ্যতালিকার ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কলা হতে পারে। কাঁচা কলায়, বিশেষ করে খোসায় ট্যানিন থাকে, যা স্বাদ কষা করে এবং পশুর রুচি কমায়; কলা পাকলে ট্যানিন কমে।
ছোলার দানায় অপরিশোধিত আমিষ থাকে প্রায় ১৯ থেকে ২৫ শতাংশ, শ্বেতসারও প্রচুর; দেশি ধরনের ছোলার শুষ্ক পদার্থে শ্বেতসার প্রায় ৩৫ শতাংশ। ফিডিপিডিয়ার সংকলিত খাদ্য-পরীক্ষায় দেখা গেছে, দুধেল গাভির দানাদার খাদ্যে সয়াবিন মিল ও ভুট্টার অর্ধেক পর্যন্ত ছোলা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়, আর বকনা বাছুরের ক্ষেত্রে দানাদার খাদ্যের ২৫ থেকে ৪৯ শতাংশ ছোলা হলে ওজন বৃদ্ধি সবচেয়ে ভালো হয়েছে।
গম ভাঙিয়ে আটা-ময়দা তৈরির উপজাত গমের ভুসিতে গড়ে প্রায় ১৭ শতাংশ অপরিশোধিত আমিষ থাকে, আঁশ ও ফসফরাসও বেশি। ফিডিপিডিয়া মাংসের জন্য পালিত গরুর খাদ্যে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ এবং দুধেল গাভির খাদ্যে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ভুসি রাখার সুপারিশ উল্লেখ করেছে এবং জানিয়েছে, ভুসির মৃদু জোলাপের মতো প্রভাব আছে। এসব পরিসংখ্যান খাদ্যগুলোর সাধারণ বিবরণ; কোনো নির্দিষ্ট পশুকে কতটা খাওয়ানো উচিত, সে বিষয়ে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিয়ম।
২০২৬ সালের ঈদুল আজহা ও মাংস বণ্টনের রীতি
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস ১৮ মে জানায়, ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে বৈঠক শেষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ঘোষণা করে, জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে এবং বাংলাদেশে ঈদুল আজহা পালিত হবে ২০২৬ সালের ২৮ মে, বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ ১০ জিলহজ। মানিক বিক্রি হয়ে কুষ্টিয়ায় পৌঁছায় সেই ঈদের ঠিক আগের দিনগুলোতে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ নামে পরিচিত ঈদুল আজহা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হওয়ার স্মৃতিবাহী, যাঁর বদলে একটি পশু কোরবানি করা হয়েছিল। ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর কোরবানির সময় শুরু হয় এবং পরের দুই দিন, মতান্তরে তিন দিন পর্যন্ত চলে; এ কারণেই ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনামতো ঈদের তৃতীয় দিনেও পশু জবাই করা যায়। গরু, মহিষ বা উট সর্বোচ্চ সাতজনের পক্ষে, আর ছাগল বা ভেড়া একজনের পক্ষে কোরবানি করা যায়।
বাংলাপিডিয়া মাংস তিন ভাগে ভাগ করার রীতির কথা বলেছে: এক ভাগ মালিক নিজে রাখেন, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেন, বাকি ভাগ দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। চামড়া নিজে ব্যবহার বা দান করা যায়; চামড়া বা তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ সাধারণত দরিদ্র, মাদ্রাসার গরিব শিক্ষার্থী বা এতিমখানায় দান করা হয়, আর নিজের কোরবানির পশুর কোনো অংশ বিক্রি করে সে অর্থ ভোগ করা বৈধ নয়। কুমারখালীর ফাউন্ডেশন যেভাবে পুরো একটি পশু রান্না করে এতিম ও দুস্থদের খাওয়ানোর কথা বলেছে, তা এই রীতির দানের দিকটিরই অনুসরণ।

২০২৬ সালে কোরবানির পশু: সরকারি হিসাব
হামিদা আক্তারের এই বিপাক এমন এক বছরে, যখন সরকার বলছিল দেশে কোরবানির প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পশু আছে। ২০২৬ সালের ৩ মে এক ব্রিফিংয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) যে হিসাব তুলে ধরেন, তাতে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, আর সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি। প্রস্তুত পশুর মধ্যে ছিল:
- গরু ও মহিষ: ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি;
- ছাগল ও ভেড়া: ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি;
- উট, দুম্বাসহ অন্যান্য পশু: ৫ হাজার ৬৫৫টি।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সারা দেশে তিন হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে, যার ২৭টি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়; সে বছর অনলাইনে পশু বিক্রি করা যাবে এবং অনলাইন বিক্রিতে কোনো ভাড়া বা মাশুল নেওয়া হবে না; ঢাকার হাটগুলোতে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করবে; দেশি খামারিদের সুরক্ষায় সীমান্ত এলাকার পশুর হাট বন্ধ থাকবে; আর পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে।
ইউএনবি জানায়, আগের ঈদের হিসাবও ব্রিফিংয়ে দেওয়া হয়, যে ঈদে মানিক প্রথমবার অবিক্রীত থেকে যায়: ২০২৫ সালে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি, কোরবানি হয় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি, আর উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার। দুই বছর আগে, ২০২৪ সালে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কোরবানিযোগ্য পশু গুনেছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি, যার সবই দেশি খামারের, প্রথম আলো ২০২৪ সালের ২১ মে এ খবর দেয়; সে বছর গরু-মহিষ আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৫ লাখ ১৬ হাজার, অর্থাৎ ১০.৬৭ শতাংশ বেড়েছিল।
কুষ্টিয়া খুলনা বিভাগের জেলা, আর ২০২৬ সালে সেই বিভাগে বড় উদ্বৃত্তের আশা করছিল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ঢাকা ট্রিবিউন ১১ মে জানায়, বিভাগের খামারি ও পশুপালকেরা প্রায় ১৪ লাখ ৪৭ হাজার পশু প্রস্তুত করেছেন, চাহিদা প্রায় ১০ লাখ ৭৯ হাজার, আনুমানিক উদ্বৃত্ত তিন লাখ ৬৭ হাজার ৩৬০টি। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ পরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি হওয়ায় দাম স্থিতিশীল থাকবে, কিছুটা কমতেও পারে; অন্যদিকে একই প্রতিবেদনে খামারিরা বলেন, পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় তাঁদের ওপর চাপ বাড়ছে।
ঈদের হাটের পেছনের প্রাণিসম্পদ খাত
কোরবানির বাজারের পেছনে আছে বড় একটি প্রাণিসম্পদ খাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখার তৈরি তথ্যপত্র ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৪-২০২৫)’ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫১.৭১ লাখ, যা ২০১৫-১৬ সালে ছিল ২৩৭.৮৫ লাখ; একই বছর মহিষ ১৫.৩২ লাখ, ছাগল ২৭২.৯১ লাখ এবং ভেড়া ৩৯.৮১ লাখ।
একই তথ্যপত্রে ২০২৪-২৫ সালে মাংস উৎপাদন দেখানো হয়েছে ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন, জনপ্রতি দিনে ১২০ গ্রাম হিসাবে চাহিদা ৭৭.৯২ লাখ টন; দুধ উৎপাদন ১৫৫.৩৮ লাখ টন, চাহিদা ১৬২.৩৩ লাখ টন। স্থির মূল্যে সাময়িক হিসাবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অবদান ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬.৫৪ শতাংশ। অধিদপ্তরের হিসাবে দেশের কর্মসংস্থানের ২০ শতাংশ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ আংশিকভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
দেলদুয়ার থেকে কুমারখালী
মানিক যেখানে বড় হয়েছে, সেই দেলদুয়ার ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলার একটি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলাটির আয়তন ১৮৪.৫৪ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা দুই লাখ সাত হাজার ২৭৮। এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ধলেশ্বরী, লৌহজং ও এলংজানী নদী; প্রধান ফসল ধান, পাট, সরিষা, আখ, আলু ও গম। ৪৭.৯১ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, আর উপজেলায় ৬০টি দুগ্ধ খামার, ২৮৫টি পোলট্রি খামার ও ২২টি মৎস্য খামারের কথা উল্লেখ করেছে বাংলাপিডিয়া। এখানকার উল্লেখযোগ্য স্থাপনার একটি প্রায় চারশ বছরের পুরোনো আতিয়া জামে মসজিদ।

ষাঁড়টির যাত্রা যেখানে শেষ হয়েছে, সেই কুমারখালী কুষ্টিয়া জেলার উপজেলা; জেলাটি ১৯৪৭ সালে তখনকার নদীয়া জেলার কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কুমারখালীর আয়তন ২৫৮.১৮ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালে জনসংখ্যা তিন লাখ ২৮ হাজার ৪৫৭। উপজেলার উত্তরে পদ্মা, ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে গড়াই ও কালীগঙ্গা। প্রধান ফসল ধান, গম, পাট, আখ ও ভুট্টা। শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, বাউল লালন শাহের সমাধি, ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা এবং তাঁতশিল্পের জন্য উপজেলাটি পরিচিত।
ফাউন্ডেশনের খামার যে ইউনিয়নে, সেই নন্দলালপুর কুমারখালীর ১১টি ইউনিয়নের একটি। বাংলাপিডিয়ায় এর আয়তন ছয় হাজার ২১৪ একর, জনসংখ্যা পুরুষ ১৬ হাজার ৬৩০ ও নারী ১৭ হাজার ০৩২ জন লেখা আছে।
ছবি: Jubair1985 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইউএনবি, ঢাকা টাইমস, ঢাকা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫), ফিডিপিডিয়া (আইএনআরএই, সিরাড, এএফজেড ও এফএও), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)